নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিযোগাযোগ খাতের রবি আজিয়াটা পিএলসির মুনাফা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। কোম্পানিটির সেলস বা বিক্রয় কমলেও মুনাফা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, পুঁজিবাজারে অনেক কোম্পানি রয়েছে যারা শেয়ার ম্যানুপুলেট করাসহ নানা অনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য মুনাফা বেশি দেখায়। মুনাফা বেশি দেখিয়ে শেয়ার কারসাজি চক্রের সাথে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ হাত মিলিয়ে শেয়ার দর বৃদ্ধি করে। আর সেই উচ্চ দামের শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয় চক্রটি এবং মার্কেট থেকে চলে যায় তারা। আর এই অনৈতিক কাজের সাথে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা থাকে।
এবার রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে এমনই অভিযোগ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা অভিযোগ করে বলেন, রবি আজিয়াটা গত বছরে (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) মুনাফা বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে রিসিভেবল বেশি দেখিয়েছে। রিসিভেবল হচ্ছে- গ্রাহকদের কাছে কোম্পানির পাওনা টাকা। এছাড়াও বিক্রয় ও বিতরণ খরচ মাত্রাতিরিক্ত কম দেখিয়েছে, যার ফলে পাঁচ বছরের (২০২০-২০২৪) মধ্যে গত বছর সর্বোচ্চ মুনাফা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ফলে মুনাফা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দরে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর রবি আজিয়াটার অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড আদার রিসিভেবল ছিল ৮৩১ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৭৭৮ কোটি ১৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। বছরের ব্যবধানে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড আদার রিসিভেবল বেড়েছে ৫২ কোটি ৯৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

অর্থাৎ গ্রাহকদের কাছে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ৫২ কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে। এই টাকা কখন উঠবে, আদৌ উঠবে কিনা সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু কোম্পানিটির মুনাফায় ঠিকই এই টাকা যোগ হয়েছে এবং গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে কোম্পানির মুনাফা সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে।
কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে রবি আজিয়াটার বিক্রয় রাজস্ব এসে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯২২ কোটি ৭৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা। আর এর আগের বছর যা ছিল ৯ হাজার ৯২৯ কোটি ৩৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বা দশমিক ০৬ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৩ সালে কোম্পানির বিক্রয় ও বিতরণ খরচ হয়েছে এক হাজার ৪০৭ কোটি ২৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আর গত বছর তা এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৯৩ কোটি ৬ লাখ ৫ হাজার টাকা। বছরের ব্যবধানে বিক্রয় ও বিতরণ খরচ কমেছে ১১৪ কোটি ২২ লাখ ২৩ হাজার টাকা।

এদিকে বিক্রয় রাজস্ব দশমিক ০৬ শতাংশ কমলেও বিক্রয় ও বিতরণ খরচ কমেছে অস্বাভাবিক অর্থাৎ ৮ শতাংশ। আর টাকার অঙ্কে কোম্পানিটির বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। কিন্তু বিক্রয় ও বিতরণ খরচ কমেছে ১১৪ কোটি ২২ লাখ ২৩ হাজার টাকা, যা অস্বাভিক বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, বিক্রয় রাজস্বের তুলনায় বিক্রয় ও বিতরণ খরচ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় কোম্পানিটির মুনাফা অতিতের যেকোন সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিক বেড়েছে। আদৌ এই মুনাফা হয়েছে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত বছর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বা মুনাফা হয়েছে এক দশমিক ৩৭ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল দশমিক ৬০ টাকা। বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে দশমিক ৭৭ টাকা বা ১২৮ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের ২৭ মে রবি আজিয়াটার শেয়ার দর ছিল ২৩ দশমিক ১ টাকা। আর একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর শেয়ার দর এসে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪ টাকা। প্রায় সাড়ে ৩ মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৩ টাকা বা ৪০ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, উল্লেখিত সময়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কারসাজি চক্রের সাথে যোগসাজস করে এই ৪০ শতাংশ শেয়ার দর বাড়িয়েছিল।
আর আজ (২৭ অক্টোবর) শেয়ারটির দর এসে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৮০ টাকা। গত প্রায় দেড় মাস ধরে শেয়ারটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সেল (বিক্রয়) করে মার্কেট থেকে চলে যাচ্ছে কারসাজি চক্রটি।
এদিকে, সত্যিকার অর্থে কোম্পানিটির দেখানো মুনাফা যে সঠিক নয় তার প্রমান পাওয়া গেছে ইমপ্লয়ি বেনিফিটে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ইমপ্লয়ি বা কর্মকর্তা-কর্মচারী বেনিফিটস কম পেয়েছে ৩৩ কোটি ২৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেনিফিটস পেয়েছেন ৫৭ কোটি ১৬ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ৮৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। বছরের ব্যবধানে ইমপ্লয়িদের বেনিফিটস কমেছে ৫৮ শতাংশ।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর যদি কোম্পানির উল্লেখিত মুনাফা সত্যিই অর্জিত হতো তবে, ইমপ্লয়ি বেনিফিটস বাড়তো। কিন্তু ইমপ্লয়ি বেনিফিটস না বেড়ে বরং কমেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় কোম্পানিটির মুনাফা বাড়েনি, বরং কমেছে। অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা নয়-ছয় করে বেশি দেখিয়েছে, যা বাস্তবতার সাথে কোনো মিল নেই।
এছাড়াও রবি আজিয়াটার হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণও কমেছে। ২০২৩ সালে কোম্পানিটির ক্যাশ অ্যান্ড ক্যাশ ইকুইভ্যালেন্টস বা নগদ অর্থ হাতে ছিল ৩২৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২২৯ কোটি ১১ লাথ ৯১ হাজার টাকা। বছরের ব্যবধানে রবি আজিয়াটার নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছে ৯৫ কোটি ৪৭ লাখ ৯ হাজার টাকা।
এসমব বিষয় জানতে রবি আজিয়াটার কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ শাহিদুল আলমের সাথে গতকাল রবিবার (২৬ অক্টোবর) যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানতে চাওয়া প্রশ্নসমূহ তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে পাঠাতে বলেন। পরবর্তীতে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমের এই প্রতিবেদক প্রশ্ন পাঠায়। আজকে দিন শেষে প্রশ্নসমূহের উত্তর দেবেন বলে তিনি সকালে জানান। কিন্তু এই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোন উত্তর দেয়নি।
বাংলাদেশে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশীদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, রবি আজিয়াটা যখন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় তখন আমরা ভেবেছিলাম প্রতিষ্ঠানটি অনেক ভালো করবে। কিন্তু মোটেও ভালো করছে না। কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট দুর্নীতিগ্রস্ত। কোম্পানিটি শেয়ারকারসাজি চক্রের সাথে যোগসাজস করে শেয়ার দর ম্যানুপুলেট করছে। মুনাফায় তারতম্য করছে। অনতিবিলম্বে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে আমরা মনে করি।
উল্রেখ্য, পরিশোধিত মূলধন ৫ হাজার ২৩৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে, উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৯০ শতাংশ। এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ২ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
ডেইশি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments