নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যবসায়িকভাবে খাদের কিনারে থাকা মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি গ্রাহকদের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে। সেভিংস অ্যাকাউন্টে (সঞ্চয়ী হিসাব) থাকা মোট অর্থ থেকে কিছু অংশ কোনো গ্রাহক মাসে একাধিকবার লেনদেন (ট্রানজেকশন) করলে, সেটিকে মাল্টিপল ট্রানজেকশন হিসেবে গণ্য করে ব্যাংকটি। আর মাল্টিপল ট্রানজেকশনের অজুহাতে সেভিংস অ্যাকাউন্টে থাকা অবশিষ্ট অর্থের বিপরীতে গ্রাহকদেরকে কোনো সুদ (ইন্টারেস্ট) প্রদান করে না মার্কেন্টাইল ব্যাংক। অর্থাৎ মার্কেন্টাইল ব্যাংক মাল্টিপোল ট্রানজেকশনের নামে গ্রাহকদের সাথে সরাসরি প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও ব্যাংকটি সঠিক সময়ে আর্থিক প্রতিবেন প্রকাশ না করে সিকিউরিটিজ আইনও অমান্য করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, দেশের অন্যান্য ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্ট দিয়ে মাসে একাধিকবার ট্রানজেকশন করলেও গ্রাহককরা অ্যাকাউন্টে থাকা অবশিষ্ট অর্থের বিপরীতে ইন্টারেস্ট পেয়ে থাকেন। এটাই বাংলাদেশ ব্যাংকের রুলস। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই রুলসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অমান্য করছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। দীর্ঘদিন ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের শাসনামলে মার্কেন্টাইল ব্যাংক নির্দ্বিধায় এরকম বাংলাদেশ ব্যাংকের অসংখ্য রুলস ভঙ্গ করেছে, যা এখনো বলবৎ রেখেছে ব্যাংকটি।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ডেমরা ব্র্যাঞ্চের গ্রাহক এম.এইচ রনি। তিনি ডেইলি শেয়ারাবাজার ডটকমকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের গ্রাহক। আমি ব্যাংকটিতে আমার সঞ্চয়ী হিসাব থেকে কিছু টাকা লেনদেন করেছি। বেশিরভাগ অর্থই আমার সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে। অথচ সেই অর্থের বিপরীতে আমাকে কোনো সুদ দিচ্ছে না মার্কেন্টাইল ব্যাংক।
তিনি আরও বলেন, আমি ব্যাংকের সাথে এব্যাপারে যোগাযোগ করেছিলাম। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলেছে, সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা সঞ্চয়ী হিসাব থেকে মাসে দুইবারের বেশি ট্রানজেকশন করলে সেটি মাল্টিপোল ট্রানজেকশন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর মাল্টিপোল ট্রানজেকশন হলে সেই অ্যাকাউন্টে যত টাকাই থাকুক না কেন কোনো সুদ দেওয়া হয় না। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, অন্যান্য ব্যাংকেতো এধরনের ট্রানজেকশন করলে সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে থাকা অবশিষ্ট অর্থের বিপরীতে সুদ দেয় গ্রাহকদেরকে। তাহলে আপনারা দেবেন না কেন জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিতে পারেনি ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, এম.এইচ. রনির মতো হাজারো সম্মানিত গ্রাহক প্রতিনিয়ত ব্যাংকটির মাধ্যমে এভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। এব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
(মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে সাত পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো তৃতীয় পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে পরবর্তী পর্ব।)
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, ব্যাংকটিতে সেভিংস অ্যাকাউন্ট চালু করলে আমাদেরকে লেনদেনের জন্য ডেবিট কার্ড প্রদান করা হয়। যাতে করে এটিএম বুথের মাধ্যমে ট্রানজেকশন করতে পারে গ্রাহকরা। কিন্তু একাধিকবার ট্রানজেকশন করলেই মাল্টিপোল ট্রানজেকশন হিসেবে গণ্য করা হয়। এটাতো ঠিক না।
তারা আরও বলেন, এধরনের ট্রানজেকশনকে যদি মাল্টিপোল হিসেবে গণ্য করা হয় তাহলে গ্রাহকদেরকে ডেবিট কার্ড প্রদান করে কেন?। ব্যাংকটির এই ধরনের আচরণকে ভাওতাবাজি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একাধিক গ্রাহক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ব্যাংকটির সেভিংস অ্যাকাউন্টে ৬ মাস অর্থ রাখা হলে সেই অর্থের বিপরীতে বিভিন্ন রকম অপ্রয়োজনীয় চার্জ কেটে রাখে। এতে করে ব্যাংকটিতে সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলতে আমরা নিরুৎসাহিতবোধ করছি। ভবিষ্যতে আর কখনই ব্যাংকটিতে সেভিংস অ্যাকাউন্ট চালু বা খুলবো না।
এসব ব্যাপারে জানতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুখপাত্র অসিম কুমার শাহার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমের এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি মিটিংয়ে ঢুকবো। এখন কোনো কথা বলতে পারবো না।
বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এর চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, এই ধরনের ট্রানজেকশন করলেতো অন্যান্য ব্যাংক সেভিংস অ্যাকাউন্টে থাকা অবশিষ্ট টাকার বিপরীতে গ্রাহককে ইন্টারেস্ট দেয়। কিন্তু মার্কেন্টাইল ব্যাংক কেন দেয় না তা বলতে পারবো না। তবে আমি তাদেরকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে পারি।
এদিকে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অসন্তোষ’ প্রকাশ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ভবিষ্যতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ব্যাংকটিকে কড়া বার্তা দিয়েছে বিএসইসি।
বিএসইসির করপোরেট রিপোর্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী মার্কেন্টাইল ব্যাংক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনিরীক্ষিত বা বার্ষিক আর্থিক বিবরণী দাখিল করার কথা থাকলেও তা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। কমিশন এই দেরি হওয়াকে ‘ডিফল্ট’ এবং সিকিউরিটিজ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিএসইসি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আর্থিক তথ্য প্রকাশে বিলম্ব হলে বাজারে তথ্যপ্রবাহ বিঘ্নিত হয় এবং বিনিয়োগকারীদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়ে যায়। ব্যাংকটির এমন খামখেয়ালিপনার কারণে যদি কোনো বিনিয়োগকারী বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেই দায়ভার সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকটিকেই বহন করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের শৈথিল্য আর কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এব্যাপারে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, মার্কেন্টাইল ব্যাংক কমিশনের আর্থিক প্রতিবেদন সাবমিট করতে ডিলে (বিলম্ব) করেছে। এজন্য কমিশন ব্যাংকটিকে সতর্ক করেছে। ভবিষ্যতে এধরনের ডিলে করলে আইনানুগ সকল ব্যবস্থায় নেওয়া হবে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments