নিয়ম প্রতিপালনের সীমা অতিক্রম করে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত, মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি অধিক স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার রূপরেখা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের বিস্তার, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের দুর্বলতা, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতা দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের আস্থাও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংক তদারকি মূলত নিয়ম প্রতিপালনভিত্তিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই ব্যবস্থায় প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হতো আইন, বিধিমালা এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করার ওপর। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কেবল নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করলেই একটি ব্যাংক আর্থিকভাবে সুস্থ, নিরাপদ এবং টেকসই হয়ে ওঠে না। এমন বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা বাহ্যিকভাবে নিয়ম অনুসরণ করলেও পরবর্তীকালে গুরুতর ঋণঝুঁকি, তারল্য সংকট, মূলধনের ঘাটতি এবং আর্থিক দুর্বলতার মুখোমুখি হয়েছে।
প্রচলিত তদারকি ব্যবস্থার অন্যতম সীমাবদ্ধতা ছিল এর অতীতনির্ভর মূল্যায়ন। অর্থাৎ, ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং বিদ্যমান অবস্থার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। কিন্তু ভবিষ্যতে কোথায় ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে, কোন ঋণ সমস্যায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অথবা ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের কোনো সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হতো।
আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। এখন তদারকির মূল লক্ষ্য কেবল নিয়ম প্রতিপালন নিশ্চিত করা নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করা, তার প্রকৃতি ও মাত্রা মূল্যায়ন করা এবং সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
উদাহরণস্বরূপ, একটি ব্যাংক যদি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে চলতি মূলধনের জন্য ঋণ প্রদান করে এবং কয়েক মাস পরে দেখা যায় ঋণটি এখনও খেলাপি নয়, তাহলে বাহ্যিকভাবে সেটিকে স্বাভাবিক ঋণ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু যদি দেখা যায় ব্যবসায়িক লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, গুদামে পর্যাপ্ত পণ্য নেই এবং অর্থের ব্যবহার ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এমন পরিস্থিতিতে ঋণটি খেলাপি হওয়ার অপেক্ষা না করে অবিলম্বে কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই ঝুঁকিনির্ভর তদারকির মূল বৈশিষ্ট্য।
এই পদ্ধতি কোনো একক ঋণ বা একটি শাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একটি ব্যাংকের সামগ্রিক ঝুঁকির চিত্র মূল্যায়ন করা হয়। এর আওতায় ঋণঝুঁকি, তারল্যঝুঁকি, বাজারঝুঁকি, পরিচালনাগত ঝুঁকি, তথ্যপ্রযুক্তিগত ঝুঁকি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, পরিচালনা পর্ষদের কার্যকারিতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক সক্ষমতা সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। এর মাধ্যমে কোন প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি এবং কোথায় অধিকতর তদারকি প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা সহজ হয়।
ঝুঁকিনির্ভর তদারকি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। যথাযথ আর্থিক বিশ্লেষণ, নগদ অর্থপ্রবাহের মূল্যায়ন, ব্যবসার বাস্তবতা যাচাই এবং ঝুঁকির গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত না করে ঋণ অনুমোদন করা আগের তুলনায় অনেক কঠিন হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ, ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতাও আরও সুস্পষ্ট হবে। ফলে অযৌক্তিক প্রভাব, অনৈতিক সুপারিশ কিংবা অপ্রয়োজনীয় চাপের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদনের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তবে এটিও সত্য যে কেবল একটি নতুন তদারকি কাঠামো প্রবর্তন করলেই ব্যাংকিং খাতের সব সমস্যা সমাধান হবে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, দক্ষ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পেশাগত স্বাধীনতার ওপর। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার প্রকৃত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, ঝুঁকিনির্ভর তদারকি কেবল একটি নতুন তদারকি পদ্ধতি নয়, এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি নতুন দর্শন। এর মূল উদ্দেশ্য সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পরে ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত, মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রণ করা। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এই ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে এবং ব্যাংকগুলোও যদি এটিকে নিজেদের ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে, তবে দেশের ব্যাংকিং খাত আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, স্থিতিশীল, আস্থাভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আর্থিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
লেখক
তোফায়েল করিম খান
ঋণ কার্যক্রম বিভাগ
ঢাকা ব্যাংক পিএলসি































Recent Comments