ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। দেশে অবশেষে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর প্রক্রিয়া এগিয়েছে। দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া ১২টি আবেদনের মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রচলিত ব্যাংকের মতো ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো শাখা, উপশাখা কিংবা নিজস্ব এটিএম থাকবে না। গ্রাহকরা মোবাইল ফোন ও অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই হিসাব খুলতে, টাকা জমা দিতে, লেনদেন করতে এবং ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রযুক্তিনির্ভর সেবার অংশ হিসেবে ভার্চুয়াল কার্ড ও কিউআর কোড ব্যবহারের সুযোগও থাকবে।
কম খরচে দ্রুত ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় আনা ডিজিটাল ব্যাংকের অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ, তরুণ উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এ ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৩ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আবেদন যাচাই, নীতিমালা সংশোধন এবং লাইসেন্স সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার কারণে কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেয়। এবার দ্বিতীয় দফায় পাওয়া আবেদনগুলো থেকে আটটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিশোধিত মূলধন, উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণের সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া আবেদনগুলোর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিষয়টি আগামী পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানেই চূড়ান্ত লাইসেন্সের অনুমোদন দেওয়া হবে।
২০২৩ সালের ১৪ জুন ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নীতিমালায় একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা। প্রথম দফায় মোট ৫২টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদন করে।
আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর নয়টি প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে আগ্রহপত্রও দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসিকে ২০২৪ সালের জুনে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নগদকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ সামনে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। ফলে প্রথম দফায় ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ কার্যত থেমে যায়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট ডিজিটাল ব্যাংকের নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালায় ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়। এরপর ২৬ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য নতুন করে আবেদন আহ্বান করা হলে ১২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে।
দ্বিতীয় দফার প্রক্রিয়ায় বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। বিএনপি সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের এক দিন আগে সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জরুরি পর্ষদ সভা আহ্বানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জরুরি ভিত্তিতে লাইসেন্স দেওয়ার ওই উদ্যোগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। সংগঠনটির নেতারা সভা স্থগিতের দাবিও জানিয়েছিলেন।
পরে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিজিটাল ব্যাংকের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান। এরপর দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া আবেদনগুলোর মূল্যায়ন শেষ করার কাজ জোরদার করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দ্বিতীয় দফার আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছে রবি আজিয়াটার ‘বুস্ট’, বাংলালিংক ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগ ‘নোভা ডিজিটাল ব্যাংক’, আকিজ রিসোর্সের ‘মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক’, আশার ‘মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক’, ‘আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২’, ‘৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক’, ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, ভুটানের ডিকে ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান, অ্যাপ ব্যাংক, জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক ও বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঠিক কোন আটটিকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করা হয়েছে, তা অবশ্য সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্বশীল সূত্র প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।
ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দেশের প্রচলিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, ক্ষুদ্রঋণ ও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে নতুন ধরনের ব্যাংকিং সেবা চালুর পাশাপাশি আর্থিক খাতে প্রতিযোগিতাও বাড়তে পারে।
অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ওপরও প্রযুক্তি গ্রহণ এবং ব্যবসায়িক কাঠামো আধুনিক করার চাপ তৈরি হবে। এতে ব্যাংকিং খাতে নতুন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকের সামনে কিছু ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তরুণ গ্রাহকদের বড় অঙ্কের আমানত না থাকায় শুরুর দিকে তহবিল সংগ্রহ কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া তথ্য নিরাপত্তা, গ্রাহকদের সচেতনতার ঘাটতি এবং দেশের তুলনামূলক অপরিণত ডিজিটাল অবকাঠামোও ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/অ
































Recent Comments