
আমরা খাবার খাই। সেই খাবার আমাদের শক্তি দেয়। এই অর্জিত শক্তি শারীরবৃত্তীয় ও দৈনন্দিন জীবনের নানান কাজে খরচ করি। এই সহজ সরল হিসেবের উপর ভিত্তি করেই মানুষ বেঁচে থাকে। এবার খাবারের মাধ্যমে অর্জিত শক্তি ও কাজের মাধ্যমে খরচ করা শক্তির হারে সামঞ্জস্য থাকলে আমাদের ওজন এক জায়গাতেই থাকে। আর শক্তি গ্রহণ ও খরচের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলেই ওজন বাড়ে বা কমে। ধরুন আপনি বেশি খাচ্ছেন, কিন্তু পরিশ্রম কম করছেন। তখন ওজন বাড়বে। অপরদিকে বেশি পরিশ্রম করে কম খেলে ওজন কমবে। এটাই সহজ হিসেব।
এদিকে অনেক স্থূল ব্যক্তিই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো খাবার কম খান। উপরন্তু শারীরিক পরিশ্রমও করেন। ফলে শরীরে শক্তির উৎসের প্রবেশ কমে, খরচ বাড়ে। এই কারণে মানুষটির ওজন কমতে থাকে। এই ঘটনা ভীষণ স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে এই প্রক্রিয়ায় স্থূল ব্যক্তির ওজন কমলে তাঁর স্বাস্থ্যের উপকারই হয়।
সমস্যা কখন?
গোল বাধে অন্য ক্ষেত্রে। ধরুন কোনও ব্যক্তি আগেও যেমন খেতেন, এখনও তেমনই খান। শারীরিক পরিশ্রমও আগে যেমন করতেন, আজও করেন তেমনই। তবুও হু হু করে তাঁর ওজন কমছে। মাসে প্রায় পাঁচ কেজিরও বেশি কমছে। এমন অবস্থা কিন্তু শারীরিক কোনও অসুস্থতার দিকেই ইঙ্গিত করে। সাধারণত এই অসুখগুলি শরীরের বিপাকের হার বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি কোষকলার ক্ষয় বেড়ে যায়। ফলে ওজন দ্রুত হ্রাস পায়। তাই হঠাৎ করেই ওজন কমতে থাকলে, জামা-কাপড় অহেতুক ঢিলে হতে শুরু করে দিলে অবশ্যই সতর্ক হোন। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কী কী কারণ হতে পারে?
আপনার দ্রুত ওজন কমে যাওয়ার পিছনে থাকতে পারে এই কারণগুলি—
প্রাইমারি থাইরোটক্সিকোসিস—এই রোগে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে বেশি পরিমাণে থাইরয়েড হর্মোন বেরয়। শরীরে থাইরয়েড হর্মোনের আধিক্য বিপাকক্রিয়াকে দ্রুত করে দেয়। বিপাকক্রিয়ার গতি বেড়ে যাওয়ার কারণে শরীরে শক্তি ক্ষয় অনেক বেশি হয়। ফলে ওজন কমে দ্রুত। এদিকে রোগীর খিদে ভালোই থাকে।
ডায়াবেটিস পর্যাপ্ত খিদে থাকার পরও দ্রুত ওজন কমার অন্যতম কারণ হল ডায়াবেটিস। এই রোগে শরীর খাদ্যের মাধ্যমে গৃহীত গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে না। গ্লুকোজ ইউরিন দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে শরীরে শক্তির ঘাটতি দেখা যায়। এছাড়া এই বিশেষ রোগে শরীরে উপস্থিত প্রোটিন ভেঙে পড়ে এবং দেহের বাইরে বেরিয়ে যায়। ফলে পেশির ক্ষয় হয় দ্রুত।
টিউবারকুলোসিস টিবি বা টিউবারকুলোসিসের মতো দীর্ঘকালীন সংক্রমণে ওজন দ্রুত হারে কমতে পারে। তবে বুকের টিবির তুলনায় গ্যাস্ট্রোইনটেসটিনাল টিউবারকুলোসিস হলে ওজন বেশি কমে। কারণ গ্যাস্ট্রোইনটেসটিনাল টিবিতে রোগীর খাবারে অরুচি আসে। তিনি খেতে পারেন না। স্বভাবতই ওজন কমে দ্রুত।
ক্যান্সার যে কোনও ধরনের ক্যান্সারই শরীরে শক্তির দ্রুত ক্ষয়ের কারণ হতে পারে। ফলে ক্যান্সার হলে অনেক ক্ষেত্রেই ওজন কমে। তবে সমস্ত ধরনের ক্যান্সারের তুলনায় গ্যাস্ট্রোইনটেসটিনাল ক্যান্সার, অর্থাৎ পাকস্থলী, অন্ত্র, লিভার, খাদ্যনালীর মতো জায়গায় ক্যান্সার হলে ওজন দ্রুত কমে। কারণ খাদ্য হজমের প্রক্রিয়ায় শরীরের এই অংশগুলির ভূমিকা অনেক বেশি। তাই এই অংশে কর্কট রোগ ছড়িয়ে পড়লে খাবারকে পরিপাক করে শক্তি সঞ্চয় করতে সমস্যা হয়। আর পর্যাপ্ত শক্তির অভাবে ওজন কমে দ্রুত।
অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা কিছু মানুষ খাবার খাওয়ার আগেই নিজের ওজন নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে পড়েন। প্রধানত মহিলারা, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সি মহিলারা এই রোগের কবলে বেশি পড়েন। এঁদের ধারণা থাকে, কিছু খেলেই যেন ওজন বেড়ে যাবে, মোটা দেখাবে। দ্রুত ওজন কমলেও এই মানুষগুলি মনে করেন, তাঁরা পরিমাপ মতোই খাচ্ছেন এবং তাঁদের ওজন ঠিকই রয়েছে। এই অসুখেরই নাম অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা। সাধারণত এই ধরনের রোগী অবসাদের শিকার হন। পাশাপাশি সারা শরীরে ব্যথাও থাকতে পারে।
অপুষ্টি পর্যাপ্ত খাওয়াদাওয়ার পরও অনেকের ওজন কমে। এর কারণ হতে পারে খাবার সঠিকভাবে শরীরে পরিপাক না হওয়া। সাধারণত বাচ্চাদের মধ্যেই এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। খুব রোগা হওয়া, খেতে না পারা, বারবার ডায়ারিয়া হওয়া ইত্যাদি এই রোগের দিকেই ইঙ্গিত করে।
সারকোপিনিয়া বৃদ্ধ বয়সে অবসাদ, স্মৃতিভ্রংশের মতো সমস্যার কারণে অনেকে খেতে পারেন না। তখন দ্রুত ওজন কমে।
পরিশেষে
দ্রুত ওজন কমার উপসর্গকে কোনও সময়ই অগ্রাহ্য করবেন না। আবার ভয়ও পাবেন না। শুধু যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যত তাড়াতাড়ি ওজন কমার কারণ সম্বন্ধে জানা যাবে, ততই চিকিৎসা করতে সুবিধে হবে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/অমি.





























Recent Comments