ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার বিস্তার। এতে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন শিশুর অভিভাবকরা।বছরের শুরুতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও মে-জুন মাস থেকে ডেঙ্গু ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এ বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৬৭ জনের। আর গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এ বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ ৮২০ ডেঙ্গু রোগী। এর আগে গত ৪ জুলাই এক দিনে সর্বোচ্চ ৬৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক নিশাত জাহান বলেন, প্রতিদিনই হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুরা আসছে। ডেঙ্গুতে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, চতুর্থ তলায় আমাদের ডেঙ্গু ওয়ার্ড, তবে সেখানে বেড ফাঁকা না থাকায় হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে।
তিনি আরোও বলেন, এই মাত্র একটি শিশু এসেছে শক সিনড্রোম নিয়ে। জ্বর সেরে যাওয়ার তিন দিন পরে হাসপাতালে এসেছে, এখন তার অবস্থা খুব একটা ভালো না। তিনি বলেন, এবার জ্বর ছাড়াও পেটে ব্যথা, পাতলা পায়খানা, বমি নিয়ে হাসপাতালে আসছে শিশুরা, আসার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে।
শনিবার ৮ জুলাই ঢাকা শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ছয়দিন ধরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে সাত বছর বয়সি শিশু আইদান, সে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কাদিরাবাদ হাউজিংয়ে বসবাস করে।
শিশুটির অভিভাবক আনিস রহমান জানান, শিশুটিকে দেখভাল করার কাজে নিয়োজিত বিথী (১৫) ও আইদান বাসার ছাদে বৃষ্টিতে গোসল করতে গেলে তাদের ডেঙ্গু মশা কামড়ায় তার একদিন পরেই তাদের দুই জনেরই জ্বর আসে। বর্তমানে তারা দুই জনই শিশু হাসপাতালের ১৬ ও ১৭ নম্বর বিছানায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। জ্বর সেরেছে, তবে চিকিৎসক বলেছেন, তাদের দুজনের অবস্থাই ক্রিটিক্যাল। আমরা অত্যন্ত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড চতুর্থ তলায় কথা হয়, ১০ বছর বয়সি সাজিম ও তার মায়ের সঙ্গে। সাজিম যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসায় আবাসিকে থেকে লেখাপড়া করে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পর তার জ্বর আসে। সাজিমের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। জ্বরের সঙ্গে গায়ে র্যাশ দেখা দিলে, ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে খাওয়ান সাজিমের মা। জ্বর না সারায় তারা গত মাসের ২৭ তারিখে কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করায় সাজিমকে। শিশুটির অবস্থা খারাপ হওয়ায় কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সাজিমের মা বলেন, ওর বাবা থাকেন সৌদি আরবে, আমি একলা ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে খুব ভয়ে আছি।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ১১৮ জন। তাদের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৫৭৪ জন। আর ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৫৪৪ জন। একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯ হাজার ৫৪৯ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৬ হাজার ৭৫০ জন এবং ঢাকার বাইরের ২ হাজার ৭৯৯ জন।
এর আগে ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২৮১ জন মারা যান। ঐ বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ডেঙ্গুতে ২৭ জনের মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে ঐ বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৬২ হাজার ৩৮২ জন। ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গু সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। একই বছর দেশব্যাপী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ঠেকাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকার সব হাসপাতালসহ ৬৪ জেলার সিভিল সার্জনকে জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে।
এতে বলা হয়, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কোনো রোগী হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছলে তার চিকিৎসা দিতে হবে। কেউ এ ব্যাপারে শৈথিল্য দেখালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. রাশিদা সুলতানা বলেন, সব হাসপাতাল রেডি রয়েছে। যে কেউ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে, তার চিকিৎসা দিতে হবে। সেভাবেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সবাইকে সেবা নিতে হবে। আমি বলব, সবাইকে মশারি টানিয়ে ঘুমাতে। নিজবাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবেন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর শুরুতে প্রচণ্ড জ্বর আসে, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শরীর-চোখ ও পেট ব্যথা করে। অনেকের বমি হয়। প্রায় চার দিন টানা জ্বর থাকার পর কমে যায়। তখন থেকে ডেঙ্গুর কমপ্লিকেশন যেমন—প্লাজমা লিকেজ, পেটে-বুকে পানি জমা ও রক্তের প্লাটিলেট কমে যায়। হেমোরজিক বা দাঁত, নাক, ফুসফুস, পায়খানার সঙ্গে রক্তক্ষরণ হয়। অনেক শিশু অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। এভাবে নানা উপসর্গ নিয়ে শক সিনড্রোম দেখা দেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৫৭ জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অসংখ্য ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তবে সব হিসাব হয়তো সরকারের খাতায় আসছে না।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/আই.
































Recent Comments