
গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) আয়োজিত ‘পুঁজিবাজারে করোনা ভাইরাসের প্রভাব ও পুনরুদ্ধারের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর.এফ হুসাইন বলেন “ফ্লোর প্রাইজের কারনে শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে”। উনার মতে “ফ্লোর প্রাইজের কারণে মার্কেটে তারল্যের মন্দাবস্থা।” আমি উনার বক্ত্যবের সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করছি। সত্য বলতে গত ১০ বছর থেকেই পুঁজিবাজারের লেনদেনে মন্দা চলছে। যে সকল ব্যক্তি বর্তমান করোনাকালে পুঁজিবাজারে লেনদেন মন্দার জন্য ফ্লোর প্রাইজকে কারন হিসেবে মনে করছেন তাদের উদ্দেশ্য আমি কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছি।
নিচের প্রশ্ন গুলোর উত্তর বলে দিবে বর্তমান পুজিবাজারে ফ্লোর প্রাইজ কতটা গুরুত্ব বহন করে।
১) গত ১০ বছর থেকে পুঁজিবাজারের লেনদেন ছিল নিম্নমুখী। ২০১০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গড় লেনদেন ছিল ১৬৪৩ কোটি টাকা। সেখানে গত ১০ বছরে ৪৬% নুতন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার পরও ২০১৮ সালে বাজারের গড় লেনদেন ছিল ৫৫১ কোটি এবং ২০১৯ সালের গড় লেনদেন ছিল ৪৮০ কোটি টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে কেন ১০ বছরেও পুঁজিবাজারের লেনদেন বৃদ্ধি পায়নি?
২) গত ১০ বছরে পুঁজিবাজারের এক তৃতীয়াংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম তার অভিহিত মূল্যের নিচে চলে গেছে অর্থাৎ ১০ টাকার নিচে কিন্তু কেন? এতো গুলো কোম্পানির মূল্য অভিহিত মূল্যের নিচে থাকার পরও কেন ক্রেতা আসছে না?
৩) ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে শেয়ার সংখ্যা ছিল ২১ হাজার কোটি। বর্তমানে পুঁজিবাজারে শেয়ার সংখ্যা ৬৭ হাজার কোটি। ২০১০ সালে ইনডেক্স ছিল ৯০০০। প্রায় তিন গুন শেয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির পরও কেন ইনডেক্স এতো নিচে? আজ ৬৭ হাজার কোটি শেয়ার নিয়েও ইনডেক্স কেন ৪০০০?
৪) গত ১০ বছরে ৯৮টি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে এর মধ্যে ৫১টি কোম্পানি বর্তমানে তার ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। এই সব কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার পেছনে মার্চেন্ট ব্যাংক গুলোর কি কোন দায়ভার নেই?
৫) গত ১০ বছরে ভারত এবং পাকিস্তানের ইনডেক্স বেড়ে প্রায় ৪ গুন হয়েছে। ভারতের ইনডেক্স ১৪ হাজার থেকে ৪১ হাজার আর পাকিস্তানের ইনডেক্স ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজারে উঠেছিল। অথচ গত ১০ বছরে আমাদের ইনডেক্স কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। কিন্তু কেন?
৬) ১৯ ফেব্রুয়ারী ইনডেক্স ছিল ৪৭৩৭। সেখান থেকে মাত্র ২০ কার্যদিবসেরে ব্যবধানে ইনডেক্স ১১০০ পয়েন্ট কমে যায়। বিএসইসি ১৯ মার্চ পুঁজিবাজারে ফ্লোর প্রাইজ নির্ধারণ করে। এর আগে ফ্লোর প্রাইজ ছিল না। তাহলে আগের ৪ দিন পুঁজিবাজার কেন ক্রেতা শুন্য ছিল? প্রতিদিন ১০% করে দাম কমার পরও কেন ১২, ১৫, ১৬, ১৮ তারিখ অধিকাংশ কোম্পানি ক্রেতা শুন্য ছিল?
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর.এফ হুসাইন সেমিনারে আরও বলেন ” ৮০-৯০% শতাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী দিয়ে পৃথিবীর কোন পুঁজিবাজার উপরের দিকে যেতে পারে না” তিনি আরও বলেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাব রয়েছে। তার বক্তব্য গুলো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিরোধী। উনার প্রতিটি বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। গত ১০ বছরে অখ্যাত দুর্বল কোম্পানিগুলো কিন্তু অজ্ঞ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তালিকাভুক্ত করেনি, করেছে ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি জ্ঞান সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠান গুলো। ফিনান্সিয়াল রিপোর্ট নিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ঘষা-মাজা করতে পারেনা। এই ঘষা-মাজা করে ভুল তথ্য তৈরি করে ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি জ্ঞান সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানগুলো। তাই বর্তমান বাজারের এই দুরবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি জ্ঞান সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠান গুলো। সুশাসনের অভাবে এরা গত ১০ বছর থেকে যা ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছে।
গত ১০ বছরে পুঁজিবাজারে স্টেক হোল্ডারা যদি তাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতো তাহলে পুঁজিবাজারের এই দৈন দশা আসতো না। আজকের এই ফ্লোর প্রাইজের সৃষ্টিই হতো না, যদি ব্যাংক গুলো তাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতো। অথচ বেশিও ভাগ মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ব্রোকারেজ হাউজ গুলো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পুঁজিবাজারকে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিএসইসির উচিত হবে এই মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে কড়া নজরদারির মধ্যে আনা। এদের বিষয়ে তদন্ত করা। অনেক থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। সুবিধা ভোগীরা শুধু সুবিধাই নিবে এদের দিয়ে পুঁজিবাজারের উন্নতি হবে না।
একমাত্র সুশাসন পারে বিনিয়োগকারীর অর্থের নিরাপত্তা দিতে। সবাই যখন বুঝতে পারবে পুঁজিবাজারে সুশাসন রয়েছে তখন বাজারে টাকার অভাব হবে না। তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, ডিএসই, আইসিবি সহ পুঁজিবাজারের সকল স্টেক হোল্ডারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত অর্ধেক কোম্পানির ফ্লোর প্রাইজ তার ইস্যু মূল্যের নিচে রয়েছে। বর্তমানে ফ্লোর প্রাইজে ৮০% বিনিয়োগকারী দেউলিয়া। অথচ এরপরও কেউ কেউ লেনদেনের ধোঁয়া তুলে ফ্লোর প্রাইজের বিরোধিতা করছে। প্রকৃত পক্ষে যারা ফ্লোর প্রাইজ নিয়ে বিরোধিতা করছে তারা হয় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে অবগত নয় অথবা তাদের অসৎ কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। ফ্লোর প্রাইজ তুলে দিলে অতীতের মতন লেনদেন তো বাড়বেই না উল্টা শেয়ার গুলোর মূল্য কমে যেতে থাকবে।
পুঁজিবাজারকে একটি ভালো অবস্থানে নিতে হলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যানকে যে কোনো মূল্যে শক্ত হতে হবে। কোনো ধরনের চাপের মুখে যদি উনি নরম হয়ে যান তাহলে বাজার আর ঘুরে দাঁড়াবে না।
লেখক: মাসুদ হাসান
শেয়ার বিনিয়োগকারী
উত্তরা, ঢাকা।
ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট/মাজ./নি






















Recent Comments