ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) দেওয়া অন্তর্বর্তী রায় শুনলাম। আমরা এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।

বিশ্ব আদালত নিশ্চিত করেছেন, গণহত্যা কনভেনশনের অধীনে ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, আছে এবং আরও ঝুঁকিপূর্ণভাবে যুক্ত হতে পারে। এ আদেশ প্রশংসনীয়। আদালত আরও বলেছেন, গাজায় গণহত্যার ঘটনা এড়াতে ইসরায়েলকে অবশ্যই ‘সব ব্যবস্থা গ্রহণ’ করতে হবে। আদালত অবশ্য অবিলম্বে এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাননি, যা ইতোমধ্যে বিশ্বের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো করেছে। তবুও দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের উত্থাপিত বেশির ভাগ ‘অস্থায়ী ব্যবস্থার’ অনুরোধ আদালত অনুমোদন করেছেন। যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়ে ইসরায়েল কীভাবে এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে এবং গণহত্যা কনভেনশনের অধীনে তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারে, তা বোঝা কঠিন।
অবশ্য এমন কোনো ইঙ্গিত নেই, আদালতের বিধান মেনে চলার ইচ্ছা ইসরায়েলের আছে। প্রকৃতপক্ষে, দুই সপ্তাহ আগে আইসিজে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলার শুনানি করার পর থেকে ইসরায়েল গাজায় তার গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড দ্বিগুণ করেছে।
শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েল ২১টি গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডে ২০০ জনকে খুন করেছে এবং ৩৭০ বেসামরিক লোককে আহত করেছে। তাই আদালতের এবং বৃহত্তরভাবে বিশ্বের কাছে ইসরায়েলের বার্তা স্পষ্ট– তারা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার আইনি বা রাজনৈতিক মতামত, দাবি বা মাপকাঠিকে গুরুত্ব দেয় না। সে যেমন খুশি
তা-ই করবে।
সব মিলিয়ে গত তিন মাসে গাজার জনসংখ্যার ১ শতাংশের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং আরও ২.২ ভাগ আহত হয়েছে। বেশির ভাগ ছিটমহল ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর ২০ লাখের বেশি বাসিন্দার প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। লাগাতার অবরোধের পাশাপাশি হাসপাতালগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করার কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। চিকিৎসাসেবার কিছুই অবশিষ্ট নেই, মানুষ দুর্ভিক্ষ ও রোগে মারা যাচ্ছে। চিকিৎসাসেবার অভাবে শত শত নারীর অকাল গর্ভপাত হয়েছে এবং অনেকে প্রসবের সময় মারা গেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ দায়েরকে বিশ্ব আদালত ‘প্রশংসনীয়’ বলে মনে করছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ব্যাপারে অনীহা এবং পাশ্চাত্য থেকে নিঃশর্ত সমর্থন উপভোগ করার ফলে আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশে দেশটির আচরণে পরিবর্তন আসবে বলে আশা করার খুব বেশি কারণ নেই। তা সত্ত্বেও কেন দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলকে আইসিজের কাঠগড়ায় তুলল এবং কেন এ আদালতের শুক্রবারের আদেশ সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?
দক্ষিণ আফ্রিকা নিশ্চিত করেছে, ইসরায়েলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড অবশ্যই ইসরায়েলের ৭৫ বছরের বর্ণবাদের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত। ইসরায়েল ১৯৪৮ সাল থেকে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসহ আন্তর্জাতিক আইনের অনেক লঙ্ঘন করেছে। এর বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠী এবং অবৈধ দখলদারিত্ব প্রায় শতাব্দীকাল ধরে ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে মৌলিক মানবাধিকারকে অস্বীকার করেছে। এটি একটি বর্ণবাদী ‘জাতি-রাষ্ট্র আইন’ পাস করেছে যাতে অবৈধ ইহুদি বসতিকে জাতীয় মূল্যবোধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৪৮ সালে জাতিগত নিধন এবং ভূমি চুরির মাধ্যমে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করার পর ইসরায়েল গাজার সব জনসংখ্যাকে উপত্যকার মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। সাহসী ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইলান পাপ্পে তাঁর সর্বশেষ বইয়ে একে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারাগার বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত থেকেই ইসরায়েল জাতিগত নিধন, বর্ণবাদ, অচ্ছুৎকরণ এবং বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনের আদিবাসীদের নির্মূল করার জন্য কাজ করছে। দেশটি এখন মানব ইতিহাসে প্রথম লাইভস্ট্রিম করা এবং বিশ্বের চোখের সামনে গণহত্যা চালাচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা এমন একটি জাতি যারা নিজেই বসতি স্থাপনকারী-উপনিবেশবাদ, জাতিগত নির্মূল এবং জাতিগত বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। তারা এমন একটি জাতি যা সফলভাবে দুষ্ট বর্ণবাদী শাসনকে ধ্বংস করে বহু-জাতিগত, বহু-সাংস্কৃতিক, প্রগতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। গাজার গণহত্যায় এ দেশটি কীভাবে নীরব থাকতে পারে? না, তারা তা পারেনি।
দক্ষিণ আফ্রিকানরা স্বীকার করেছেন, গাজায় ইসরায়েলের ক্রমাগত গণহত্যার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অর্থ গণহত্যা থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকানরাও বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে বছরের পর বছর বর্ণবাদ সহ্য করেছে।
তারা বুঝতে পেরেছে, ইসরায়েলের দখলদারিত্ব এবং নিপীড়ন গণহত্যার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আর অপেক্ষা করার মতো বিলাসিতার সময় নেই। প্রতি মিনিটের নিষ্ক্রিয়তা মানে ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও ক্ষতি, আরও মৃত্যু এবং আরও হতাশা।
তাই তারা পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা ইসরায়েলকে বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতে নিয়ে গেছে এবং দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত করেছে।
ইসরায়েল আদালতের রায় এবং বিধানকে নাও মানতে পারে, তবে তাতেও দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহাসিক অবস্থানের ফলাফল অটুটই থাকবে। এই মামলার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা শুধু ইসরায়েল নয়, সমগ্র বিশ্ব বিচারব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এই মামলাটি মানবতার জন্য প্রধান টার্নিং পয়েন্ট। কারণ এটি ইতিহাসে প্রথম ঘটনা যে, গ্লোবাল সাউথের একটি দেশ সাহসিকতার সঙ্গে ঔপনিবেশিক পাশ্চাত্যের অঙ্কিত ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করেছে। দেশটি পাশ্চাত্যের প্রিয় বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি আদিবাসীদের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘদিনের অপরাধের জন্য দায়ী করার দাবি তুলেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার এ ভূমিকার কারণে আজ সমগ্র ঔপনিবেশিক পাশ্চাত্য এবং তাদের বহু শতাব্দীর চুরি, জবরদখল ও অবিচারের বিচার শুরু হয়েছে বিশ্ব আদালতে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারিকে মনে রাখবে। এই দিনটিতে বিশ্ব অবশেষে একটি গণহত্যাকারী রাষ্ট্র এবং এর শক্তিধর সমর্থকদের দীর্ঘকাল ধরে বারবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সত্যিই, একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.


































Recent Comments