শনিবার, ২৮শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeঅন্যান্যবায়ান্ন’র সেই আমগাছ
spot_img
spot_img

বায়ান্ন’র সেই আমগাছ

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: সূর্য সবেমাত্র কিরণ দিতে শুরু করেছে। গাছে গাছে শিশির ভেজা আমের মুকুল। বাংলা পঞ্জিকায় দিনটি ৮ ফাল্গুন হলেও, আবহাওয়া ছিল বেশ শীতল। তবে মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির দাবিতে বাংলার মানুষের রক্ত ছিল ভীষণ টগবগে। ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুল-কলেজের ছাত্রদের আনাগোনায় সরব হয়ে ওঠে আমতলা।

আমতলার অবস্থান ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কলা ভবনের সামনে, এখন যা ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগ। আকারে আমগাছটি ছিল গোলগাল ও বড়সড়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় প্রায়ই ওই আমগাছের নিচে মিটিং করত ছাত্ররা। সর্বশেষ ২১ শে ফেব্রুয়ারি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জড়ো হয়েছিলেন আমতলায়।

সেদিন বেলা ১১টায় আমতলায় ছাত্রসভা শুরু হয়। ভাষা সৈনিক গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার ঘোষণা দেন। সেই সময়ে গেটের বাইরে ছিল খাকি হাফপ্যান্ট পরা পুলিশ বাহিনীর সতর্ক অবস্থান। তাদের কারো হাতে অস্ত্র, কেউ-বা লাঠি হাতে দাঁড়ানো। পাশে সারি সারি জিপগাড়ি ও ট্রাক। এমন অবস্থাতেই আমতলা থেকে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলার’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে বের হলো মিছিল। পরের ঘটনা সবারই জানা। পুলিশ গুলি চালায়। শহিদ হন বরকত, জব্বার, রফিকসহ বেশ কয়েকজন ভাষা সৈনিক।

সেই আমগাছের আত্মকাহিনি-
বায়ান্ন’র সেই ঘটনার পর আমগাছটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক-এ আমগাছটির ছবি প্রকাশিত হয়। তাতে গাছটিকে বহাল তবিয়তেই দেখা যায়। গাছে আমের মুকুল থেকে বেরিয়েছে ছোট ছোট আমগুটি। সেইসঙ্গে আমতলা গেটও ছিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সচল। তবে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন স্থাপনার সঙ্গে এই আমগাছটিও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭৪ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ছবিতে ঐতিহাসিক আমগাছটির বেহাল দশা দেখা যায়।

ভাষা আন্দোলনের সাক্ষী ওই আমগাছটি একটা সময় মারা যেতে শুরু করে। দেশ স্বাধীনের পর গাছটি বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গোলাগুলির প্রভাব ও যুদ্ধকালীন অযত্নের পর ১৯৮৮ সালে গাছটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। তবে সেই গাছের আম থেকে চারা সংগ্রহ করে পরের বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি একই স্থানে একটি চারা লাগানো হয়। সেটাকেও বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখা যায়নি।

১৯৯৫ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর নজরুল ইসলাম ডাকসুকে চিঠি দিয়ে মৃত গাছটি কেটে আনার অনুমতি দেন। ২২ নভেম্বর গাছটি কেটে ডাকসু সংগ্রহশালায় রাখা হয়। আজও সেই আমগাছের কিছু অংশ সংরক্ষিত আছে।

প্রধানমন্ত্রীও লাগিয়েছিলেন আমগাছ-
তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটুর উদ্যোগে ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল তত্কালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৃত গাছটির কাছাকাছি (পুরাতন পিজি হোস্টেলের সামনে) আরো একটি গাছ লাগান। গাছটিকে অনেক পরিচর্যা করার পরও সেই গাছটিও বেশি দিন টিকেনি।

তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই প্রথমে শিশু একাডেমির সামনে থেকে ২৩০ টাকা দিয়ে একটি ছোট আমের চারাগাছ কিনেছিলাম। কিন্তু সেই গাছটি কারো পছন্দ না হওয়ায় পরবর্তীকালে ১২০০ টাকা দিয়ে গুলশানের একটি নার্সারি থেকে একটি ভালো চারা কিনে আনি। প্রধানমন্ত্রী নিজে সেই গাছটি লাগান। তবে আমরা তা রক্ষা করতে পারিনি।’

আমতলা ও আমগাছ কেবলই স্মৃতি-
ঐতিহাসিক আমতলার সেই আমগাছ এখন কেবলই স্মৃতি। জায়গাটি ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরোনো জরুরি বিভাগে ঢুকে কিছুটা ডানে গিয়ে বাঁয়ের মোড়ে। আমগাছটির দক্ষিণে ছিল মধুর ক্যানটিন। কালের বিবর্তনে বেশ বদলও ঘটেছে এসব স্থানের। জায়গাটি আগে বেশ ফাঁকা থাকলেও এখন সেখানে দেখা মিলবে সারি সারি অ্যাম্বুলেন্স। এসবের ভিড়ে অরক্ষিত অবস্থায় একটি নিমগাছ এবং নতুন আমগাছ দেখা যায়।

শুধু কি আমগাছ? অবৈধ দখলে মলিন আমতলা গেটও। বায়ান্ন’র ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে, আমতলার ছাত্রসমাবেশ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গেট দিয়ে বের হতে থাকে ১০ জনের একেকটি খণ্ড মিছিল। সে সময় থেকেই এই গেট ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় দখল করে আছে। অথচ ৭২ বছরেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভাষা আন্দোলনের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

গেটের ওপরে হাতে লেখা দুই ফুট দৈর্ঘ্যের সাইনবোর্ডটি না থাকলে জানার কোনো উপায় নেই যে—এটি সেই ঐতিহাসিক আমতলা প্রাঙ্গণে প্রবেশের পথ। গেট ঘেঁষে চায়ের দোকান ও খাবারের হোটেল। ভাজা হচ্ছে পুরি-শিঙাড়া। ফুটপাতে ফল-পানি-বিছানা-বালিশের দোকান। আরেকটু সামনে কয়েকটি ভ্যান আছে নারকেল ডাব নিয়ে। বলে রাখা ভালো, এমন দৃশ্য কেবল ২১ শে ফেব্রুয়ারির আগে ও পরের কয়েকদিনে দেখা মেলে না!

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো। বর্তমানে বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মানুষ দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করছে। অথচ যে জায়গা একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী, সেই আমতলা আজও অমর্যাদায় পড়ে রয়েছে। রক্ষা করা যায়নি আম গাছটিও।

 

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments