সোমবার, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeএক্সক্লুসিভঋণ খেলাপির বেড়াজালে আইডিএলসি ফাইন্যান্স, আস্থাহীনতায় আমানতকারীরা (পর্ব-১)
spot_img
spot_img

ঋণ খেলাপির বেড়াজালে আইডিএলসি ফাইন্যান্স, আস্থাহীনতায় আমানতকারীরা (পর্ব-১)

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের আইডিএলসি ফাইন্যান্সের শ্লোগান হচ্ছে ‘ফাইন্যান্সিং হ্যাপিনেন্স’ বা ‘অর্থায়নের মাধ্যমে সুখ’। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, অর্থায়নের মাধ্যমে সুখের পরিবর্তে ৫০০ কোটি টাকার অধিক ঋণ খেলাপিতে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর এই ঋণ খেলাপির ফলে প্রতিষ্ঠানটির ওপর আমানতকারীদের আস্থা, আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্রটি জানায়, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের জটিলতায় বিপর্যস্ত ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতের বেশ কিছু কোম্পানি। সম্প্রতি ‘ব্যাংক রেজুলিউশন অর্ডিন্যান্স-২০২৫’ অনুযায়ী এই খাতের ৯টি প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।

(আইডিএলসি ফাইন্যান্সের অনিয়ম নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।) 

প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ— ঋণ খেলাপি, আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতা। বহু গ্রাহকের স্কিমের মেয়াদ বহু আগেই পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু তারা বছর বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। মূলত ঋণ খেলাপির কারণেই বন্ধ হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।

দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই ঋণ খেলাপির বেড়াজালে পড়েছে আইডিএলসি ফাইন্যান্স। ঋণ খেলাপির কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আমানতকারীদের আস্থা, বিশ্বাস কমতে শুরু করেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রতিষ্ঠানটির নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ। রয়েছে উদাসীনতা।

আইডিএলসি ফাইন্যান্সের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মাসুদ করিম মজুমদার এব্যাপারে লিখিত বক্তব্যে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, কোভিড-১৯ মহামারী অর্থবাজারে ব্যাপক পুনর্গঠন, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং উর্ধ্বমুখী মুদ্রাস্ফীতি গ্রাহকদের ওপর চাপ তৈরি করেছে। বিরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনেক গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমিয়েছে, অনেকের ক্ষেত্রে সময়কাল দীর্ঘয়িত করেছে। এটি গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ পুনঃপরিশোধের প্রবণতাও কমিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহের জন্য এনপিএল, অর্থাৎ মন্দ ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

এদিকে খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, অস্বচ্ছ আর্থিক বিবরণী, সম্পদ ফুলিয়ে দেখানো, লোকসান আড়াল করা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে এনবিএফআই খাতে নেমে আসে অচলাবস্থা। আইডিএলসি ফাইন্যান্সও সেই অচলাবস্থার পথেই হাঁটছে। এটা আমানতকারীদের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের ঋণ খেলাপির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৫০২ কোটি ২৭ লাখ ৬১ হাজার ৯৫ টাকা।

এদিকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মোট সম্পদের পরিমাণ কমেছে উল্লেখযোগ্যহারে।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ হিসাব বছরে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৬৭ লাখ ৭২ হাজার ১০৪ টাকা। আর ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২৮২ কোটি ২৫ লাখ ৯৩ হাজার ৫৯ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির মোট সম্পদ কমেছে ৫ কোটি ৪১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৫ টাকা।

এব্যাপারে মাসুদ করিম মজুমদার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ২০২৪ সালে আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল আমাদের ব্যালেন্সশিটকে আরো শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করে তোলা। দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছি। এর প্রভাবে গত বছর আমাদের পোর্টফোলিও ০.৪৩ শতাংশ হ্রাস পায়, যার ফলশ্রুতিতে কোম্পানির মোট সম্পদের পরিমাণ ৫ কোটি টাকা কমে যায়।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যেকোনো ভালো প্রতিষ্ঠান তার সম্পদ বৃদ্ধির জন্য প্রতিকূল পরিবেশেও চেষ্টা করে। কিন্তু ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করা আইডিএলসি ফাইন্যান্স ঝুঁকি নেওয়ার ভয়ে সম্পদের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে, যা গ্রাহকদের জন্য অনভিপ্রেত, অপ্রত্যাশিত বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মোট আনরিয়েলাইজড লোকসান এসে দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ১৯ লাথ ৮ হাজার ৯২৭ টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সিকিউরিটিজ বা শেয়ারে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের বিনিয়োগ ছিল ১৬৭ কোটি ৫১ লাখ ৮৬ হাজার ১১৪ টাকা। আর ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে শেয়ারের মূল্য কমে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ১৪৭ কোটি ৩২ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৭ টাকা। এক্ষেত্রে আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ১২ শতাংশ।

এই আনরিয়েলাইজড লোকসান আইডিএলসির ম্যানেজমেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অদক্ষতা, অপরিপক্কতার বহিঃপ্রকাশ, জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের ডিপোজিট বা আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৬৬ কোটি ৯১ লাখ এক হাজার ৬৭০ টাকা। আর একই বছরে প্রতিষ্ঠানটির লোনের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৮৪ কোটি ৭৮ লাখ ১২ হাজার ৮৫১ টাকা। অর্থাৎ আমানতের তুলনায় গ্রাহকদেরকে লোন বেশি দিয়েছে আইডিএলসি ফাইন্যান্স।

এব্যাপারে মাসুদ করিম মজুমদার সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দিতে পারেননি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, যেকোনো ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডিপোজিটের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত লোন বা ঋণ দিতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি।

উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে তালিকাভুক্ত হওয়া আইডিএলসি ফাইন্যান্সের পরিশোধিত মূলধন ৪৩৬ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যেখানে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত) মালিকানা রয়েছে ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments