নিজস্ব প্রতিবেদক: রিসিভেবলস বেশি দেখিয়ে কাগজে-কলমে মুনাফা বৃদ্ধি করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে কোম্পানিগুলোর। তবে সাধারণত যে সমস্ত কোম্পানিতে গুড গভর্নেন্স (সুশাসন) রয়েছে সেগুলোতে এই বিষয়টি খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, গুড গভর্নেন্স কোম্পানি হিসেবে সুপরিচিতি পাওয়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড রিসিভেবলস বেশি দেখিয়েও কাগজে-কলমে মুনাফা বৃদ্ধি করতে পারেনি। কোম্পানিটির এমন ব্যবসায়িক মন্দায় ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
(বাকিতে বিক্রয়কৃত পণ্যের অর্থ যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রাহকদের কাছ থেকে কোম্পানির হাতে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই অর্থ রিসিভেবলস হিসেবে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকে। আর এই অর্থ কোম্পানির কাছে না আসার আগেই প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় যুক্ত হয়।)
বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, বার্জার পেইন্টসের মতো কোম্পানির কাছ থেকে এরকম বিষয় গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে রিসিভেবলসের আড়ালে কোম্পানির কোনো দুরভিসন্ধি থাকতে পারে। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে (৩১ মার্চ ২০২৫) বার্জার পেইন্টসের ইন্টার কোম্পানি রিসিভেবলস (সহযোগি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা অর্থ) ছিল ৮৭ কোটি ৮৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। আর চলতি অর্থ বছরের অর্থবার্ষিকীতে তা এসে দাঁড়িয়েছে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর, ২০২৫) ১১৭ কোটি ৭ লাখ ২২ হাজার টাকা। ছয় মাসের ব্যবধানে ইন্টার কোম্পানি রিসিভেবলস বেড়েছে ২৯ কোটি ১৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বা ৩৩ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, বার্জার পেইন্টস মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। পুঁজিবাজারের বিবিধ খাতের কোম্পানিটি তার সহযোগি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রিত পণ্যের অর্থ সঠিক সময়ে উঠাতে পারছে না অথবা এখানে কোম্পানিটির অন্য কোনো মতলব থাকতে পারে। আদৌ এই অর্থ উত্তলন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ইতিমধ্যে এব্যাপারে বার্জার পেইন্টসের সুনাম ক্ষুন্ন হয়েছে।

এদিকে গত বছরের অর্ধবার্ষিকীতে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর, ২০২৪) বার্জার পেইন্টসের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছিল ৩২ দশমিক ২৩ টাকা। আর চলতি বছরের অর্ধবার্ষিকীতে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬৪ টাকা। বছরের ব্যবধানে ইপিএস কমেছে এক দশমিক ৫৯ টাকা বা ৫ শতাংশ। একই সময়ে টাকার অঙ্কে প্রফিট বা মুনাফা কমেছে ৬ কোটি ২৯ লাখ ৫ হাজার টাকা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর বার্জার পেইন্ট বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা বাবদ ২ কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) পেয়েছে। কিন্তু সদ্য বিদায়ী বছরে কোনো ডিভিডেন্ড পায়নি।

কোম্পানিটির অর্ধবার্ষিকীতে প্রফিট কমে যাওয়া ও বিনিয়োগের বিপরীতে ডিভিডেন্ড না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে, বার্জার পেইন্টস অতীত গৌরব ধরে রাখতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে সুশাসনের যথেষ্ট অভাব বা ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠানটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দর ছিল এক হাজার ৭৭৯ টাকা ৯০ পয়সা। আর সোমবার (৫ জানুয়ারি, ২০২৬) তা এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৭৯ টাকা ৭০ পয়সা। আনুমানিক সাড়ে ছয় মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দর কমেছে ৪০০ টাকা ২০ পয়সা বা ২২ শতাংশ।
এসব ব্যাপারে জানতে বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালি হক চৌধুরীকে ফোন করা হলে তিনি ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আমি ব্যস্ত আছি। কোম্পানি সচিবকে বলে দিচ্ছি আপনার সাথে যোগাযোগ করার জন্য।
পরবর্তীতে কোম্পানি সচিব খন্দকার আবু জাফর সিদ্দিক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আমরা কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। আপনি মন্তব্য ছাড়াই নিউজ করেন।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নুরুল হক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারে। কোম্পানিটি যে রিসিভেবলস দেখিয়েছে সেখানে কোনো গোপনীয় বিষয় থাকতে পারে, আবার মুনাফাতেও গোপনীয় বিষয় থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিশোধিত মূলধন ৪৯ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যেখানে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত) মালিকানা রয়েছে ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ
































Recent Comments