নিজস্ব প্রতিবেদক: শাস্তির কবলে পড়তে যাচ্ছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানিটি একের পর এক ভাঙছে আইন। আয়কর আইন অনুযায়ী, প্রফিট বা মুনাফার নির্ধারিত ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ আকারে বিনিয়োগকারীদের মাঝে বিতরণ করেনি। এতে করে সরাসরি আয়কর আইন অমান্য করেছে কোম্পানিটি। এছাড়াও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনাও অমান্য করেছে কোম্পানিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
২০১৯–২০ অর্থবছরের আয়কর পরিপত্র অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ হিসেবে দিতে হবে। এই হার পূরণ না হলে, রিটেইন আর্নিংসে রাখা বা কোম্পানিতে সংরক্ষিত সম্পূর্ণ অংশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হবে।
জানা গেছে, সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) মুনাফা হয়েছে ৪ কোটি ২৬ লাখ ৪৭ হাজার ২৯৮ টাকা। এই মুনাফার ৩০ শতাংশ এক কোটি ২৭ লাখ ৯৪ হাজার ১৮৯ টাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষণা ও বিতরণ করা উচিত ছিল কোম্পানিটির। কিন্তু কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারী, স্বাধীন পরিচালক ও উদ্যোক্তা পরিচালকদের (অন্যান্য পরিচালক ব্যতিত) জন্য মাত্র এক দশমিক ১০ শতাংশ বা ৭৩ লাখ ৯১ হাজার ৭৯ টাকা নগদ লভ্যাংশ (ক্যাশ ডিভিডেন্ড) ঘোষণা ও বিতরণ করেছে। ফলে মুনাফার ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের প্রদান না করায় রিটেইন আর্নিংসে রাখা অবশিষ্ট ৩ কোটি ৫২ লাখ ৫৬ হাজার ২১৯ টাকার উপর ১০ শতাংশ ট্যাক্স বা কর ৩৫ লাখ ২৫ হাজার ৬২১ টাকা সরকারকে দিতে হবে। আইন ভঙ্গের দায়ে কোম্পানিটি শাস্তিস্বরুপ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থাৎ সরকারকে এই অর্থ প্রদান করবে।
এদিকে কোম্পানিটির নিরীক্ষক জানিয়েছে, তিন বছরের অধিক সময় ধরে নিজেদের কাছে থাকা অবণ্টিত লভ্যাংশ ৮ লাখ এক হাজার ৮৭৯ টাকা ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) জমা দেয়নি সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস। এতে করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অমান্য করেছে কোম্পানিটি।

নির্দেশনায় বলা আছে, তিন বছর বা তিন বছরের অধিক সময় ধরে কোম্পানির কাছে থাকা অবণ্টিত লভ্যাংশ সিএমএস ফান্ডে জমা দিতে হবে। অর্থাৎ এনবিআর-এর ন্যায় বিএসইসি’র নির্দেশনাকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিযে বহাল তবিয়তে আছে সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস কর্তৃপক্ষ।
এসব নির্দেশনা কোম্পানিটি অমান্য করায় পুঁজিবাজারে এখনো যথেষ্ট সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে বলে মতামত প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
নিরীক্ষক আরও জানিয়েছে, ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডের (ডব্লিউপিপিএফ) হিসাব নিরীক্ষা না করেই দায় (লায়াবিলিটিজ) হিসেবে ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার ৪৮৮ টাকা দেখানো হয়েছে সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের আর্থিক প্রতিবেদনে। নিরীক্ষক এমফ্যাসিস ম্যাটারে তা উল্লেখ করেছে।
ডব্লিউপিপি ফান্ডের হিসাব নিরীক্ষা না করে অনুমান করে দায় হিসেবে উল্লেখিত অর্থ রাখা মোটেও যুক্তিযুক্ত হয়নি বলে মত প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, যেকোনো বিষয়ে বরাদ্দ রাখতে হলে তার পরিপূর্ণ হিসাব করে রাখতে হয়। অনুমান করে রাখলে সেখানে অসামঞ্জস্য থাকার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত হিসাব বছরে (৩০ জুন ২০২৪) সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের নিট প্রফিট বা মুনাফা হয়েছিল ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫৮ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ২৬ লাখ ৪৭ হাজার ২৯৮ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির প্রফিট কমেছে ৩২ লাখ ৩১ হাজার ৭৬০ টাকা বা ৭ শতাংশ।

এদিকে, গত চার বছর ধরে (২০২২-২০২৫) সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস বিনিয়োগকারীদের কাঙ্খিত ডিভিডেন্ড দিচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির এমন আচরণে বিনিযোগকারীরা ক্ষুব্ধ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২২ সালে ৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে এক শতাংশ এবং ২০২৫ সালে এক দশমিক ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড প্রদান করেছে সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস।

এ ব্যাপারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, গত চার বছরের অধিকাংশ সময়েই আশানুরুপ প্রফিট করেছে সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস। তারপরেও কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কাঙ্খিত ডিভিডেন্ড দেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই কোম্পানিটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ার দর দেখলেই তা বোঝা যায়।
এসব ব্যাপারে জানতে গতকাল (১২ এপ্রিল) সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সচিব টিংকু রনজন সরকারকে ফোন করা হলে তিনি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। পরবর্তীতে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বদরুল হক রুকনকে ফোন করা হলে তিনি কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মঞ্জুরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে মঞ্জুরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
বিএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো নিম্নমানের কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে বাজারের আজ বেহাল দশা। বাজারের কোনো গ্রোথ হচ্ছে না। এ সমস্ত কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদনে গোঁজামিল দিয়ে, ফুলিয়ে-ফাপিয়ে দেখিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। বাস্তবতার সাথে যার কোনো সামঞ্জস্য নেই। উৎপাদন ভালো না, ডিভিডেন্ড নিয়ে তালবাহানা করে। এ সমস্ত নিম্নমানের কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষ পয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো অসংখ্য নিম্নমানের কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই ধরনের নিম্নমানের কোম্পানি যাতে ভবিষ্যতে আর তালিকাভুক্ত না হয় সেজন্য সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সংস্কার কমিশন বিভিন্ন প্রস্তাবনা দিয়েছে। সে অনুযায়ী বিএসইসিসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেন, সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সামগ্রিক বিষয় আমরা দেখভাল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
উল্লেখ্য, সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিশোধিত মূলধন ১০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ৭০ হাজার টাকা, যেখানে উদ্যোক্তা/পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৩৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৪৭ দশমিক ১১ শতাংশ। আজ এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোম্পানির শেয়ার দর ছিল ১৪ টাকা ৫০ পয়সা।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ
























Recent Comments