ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: চালু হওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় আবারও উৎপাদন বন্ধ করেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)। একই সময়ে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। অন্যদিকে কাঁচামাল সংকটে বন্ধ রয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট সার কারখানাও। ফলে চট্টগ্রামের তিন গুরুত্বপূর্ণ সার কারখানার উৎপাদন কার্যত ব্যাহত হচ্ছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা থেকে কাফকোর উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একই সময় থেকে কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহও ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে বিষয়টি জানাজানি হয়।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, কাফকোতে এতদিন দৈনিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও সোমবার থেকে তা কমিয়ে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা ও কারখানার চাহিদার ভিত্তিতেই এ সরবরাহ কমানো হয়েছে।
কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী কারখানাটিতে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ করা হবে।
তবে কাফকো কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া উৎপাদন বন্ধের মূল কারণ নয়। নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।
কাফকোর চিফ অব পার্সোনেল ফারুখ আহমেদ বলেন, প্ল্যান্টের সচলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন বছর পরপর এক থেকে দেড় মাসের জন্য বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এবারও নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ওভারহোলিং চলছে। রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সমন্বয়ের কাজ শেষ হলে কারখানাটি আবার পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরবে।
এর আগে প্রায় দুই মাস গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকার পর গত ১ মে কাফকোতে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। প্রস্তুতি শেষে ২ মে বিকেল থেকে উৎপাদনে ফেরে কারখানাটি। তখন দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছিল।
বর্তমানে কাফকোর দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে প্রতিদিন ৩২ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়।
কাফকোর উৎপাদন বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে আনোয়ারায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) ওপরও। কারণ, কারখানাটির উৎপাদনের জন্য কাফকো থেকে পাওয়া অ্যামোনিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়।
কাফকোর পাশেই অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডও দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে চলতি বছরের ৪ মার্চ কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ হয়। এরপর ২৫ আগস্ট সকালে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও প্রায় ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও কারখানাটি উৎপাদনে ফিরতে পারেনি।
সিইউএফএলের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেও কারখানাটির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। একসময় প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে কার্যকর সক্ষমতা কমেছে।
কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ থাকার ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিইউএফএল মাত্র পাঁচ দিন চালু ছিল। ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হওয়ার পর ওই বছরের ১৩ অক্টোবর এটি চালু হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায়।
২৬ ফেব্রুয়ারি চালু হওয়ার পর দেড় মাসের মাথায় ১১ এপ্রিল গ্যাস সংকটে ফের উৎপাদন বন্ধ হয়। প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকার পর গত বছরের ২ নভেম্বর কারখানাটি চালু করা হলেও ওই দিনই আবার বন্ধ হয়ে যায়। পরে চলতি বছরের ২ মার্চ উৎপাদন শুরু হলেও মাত্র দুই দিন পর ৪ মার্চ গ্যাস সংকটে ফের বন্ধ হয়ে যায়।
গেল ২৫ আগস্ট সকালে কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। এতে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা সিইউএফএলে শিগগির ইউরিয়া উৎপাদন শুরুর আশা তৈরি হয়েছিল। তবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত উৎপাদনে ফিরতে পারেনি কারখানাটি।
আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট সার কারখানাটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল রাতে কারখানায় মজুত থাকা শেষ অ্যামোনিয়া শেষ হয়ে গেলে প্রথম দফায় উৎপাদন বন্ধ হয়।
পরবর্তী সময়ে কাফকোতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে সেখান থেকে অ্যামোনিয়া নিয়ে ৮ মে আবার উৎপাদনে ফেরে ডিএপি কারখানাটি। কিন্তু জর্ডান থেকে আমদানি করা ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় ২৮ জুন সকাল ৮টা থেকে কারখানাটির উৎপাদন আবার পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
কারখানাটিতে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন ফসফরিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয়। সর্বোচ্চ প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন এ কাঁচামাল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে কারখানাটির। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন শুরুর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ডিএপিএফসিএলের দুটি ইউনিটে প্রতিদিন ৮০০ টন করে মোট ১ হাজার ৬০০ টন ডিএপি সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
চট্টগ্রামের তিন গুরুত্বপূর্ণ সার কারখানার উৎপাদন বারবার ব্যাহত হওয়ায় দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ছে। গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ঘাটতির কারণে কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় উৎপাদনের বাইরে থাকছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। সংসদে কৃষিমন্ত্রীও এ চাহিদার কথা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর হিসাবে, বিসিআইসির কারখানাগুলো থেকে প্রায় ১০ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের বিপরীতে বাকি প্রায় ১৬ লাখ টন আমদানি করতে হতে পারে।
ফলে দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন বারবার ব্যাহত হলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। কাফকোর নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ দ্রুত শেষ করে উৎপাদনে ফেরানোর পাশাপাশি সিইউএফএল ও ডিএপিএফসিএলে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আসন্ন মৌসুমে দেশে সার সরবরাহে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম
































Recent Comments