নিজস্ব প্রতিবেদক: খেলাপি ঋণের রেকর্ড গড়লো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক পিএলসি (এসআইবিএল)। শুধু মাত্র ২০২৪ সালেই কোম্পানিটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। যার ফলে ব্যাংটির প্রতি আমানতকারীদের আগ্রহ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এ অবস্থায় ব্যাংকটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। কোম্পানিটির এমন বেহাল দশায় নতুন পরিচালনা পর্ষদও দায় এড়াতে পারে না। কারণ তারা পর্ষদে আসার পরেও ব্যাংকের সামগ্রিক কোনো উন্ননয় হয়নি, বলেছেন আমানতকারী থেকে শুরু করে বাজার সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসআইবিএল থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। ফলে ঋণ খেলাপিতে বড় অঙ্কের খাতায় নাম লেখায় প্রতিষ্ঠানটি। এই এস আলম গ্রুপ ফ্যাসিস্ট সরকারের আস্থাভাজন ছিল। গত বছরের (২০২৪) ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর সেই মাসের শেষের দিকে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দেওয়া হয়, নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। ফলে ব্যাংকটি এস আলম মুক্ত হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছর অতিবাহিত হলেও তারাও ব্যাংকের সামগ্রিক কোনো উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। ব্যাংকটি চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-জুন,২০২৫) আশঙ্কাজনক হারে লোকসান করেছে। এছাড়াও তারা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) প্রদান করেনি। আগের ঋণ খেলাপির সাথে নতুন করে আরও ঋণ খেলাপি যুক্ত হয়েছে, তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে এসআইবিএল’র ঋণ খেলাপির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬৩৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭৩ হাজার ৮৪৫ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল এক হাজার ৭১৬ কোটি ৩৭ লাখ ২৪ হাজার ৯৬৮ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ঋণ খেলাপি বেড়েছে ২১ হাজার ৯১৭ কোটি ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৮৭৭ টাকা।

ঋণ খেলাপি বাড়ায় কোম্পানিটির প্রতি আমানতকারীদের আস্থা এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যার প্রমাণ প্রতিষ্ঠানটির আমানত বা ডিপোজিটের দিকে খেয়াল করলেই বোঝা যায়।
২০২৩ সালে কোম্পানিটির বিনিয়োগকারীদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৬৮৫ কোটি ৪৪ হাজার ৩০৬ টাকা। ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৯২১ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৮০ টাকা। এক্ষেত্রে বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের আমানত কমেছে ৪ হাজার ৭৬৩ কোটি ৮৬ লাখ ৪ হাজার ২২৬ টাকা।

ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধিকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু যদি আমানত বৃদ্ধি না পেয়ে কমে যায় তবে সেটিকে মোটেও স্বাভাবিক বলা চলে না। আমানত কমে যাওয়া মানে সেই ব্যাংক আমানতকারীদের প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না। সে হিসেবে এসআইবিএল তার গ্রাহকদের প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ৫৫ কোটি ১৭ লাখ ৫৪ হাজার ১৩২ টাকা। আর শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে দশমিক ৮৯ টাকা, যে-কারণে ব্যাংকটি বিনিয়োগকারীদের উল্লেখিত বছরে কোনো ডিভিডেন্ড প্রদান করেনি। তবে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রাণ বিনিয়োগকারীরা শূন্য হাতে ফিরলেও পরিচালক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাত ভরে পেয়েছেন। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির পরিচালকদের ফিস বা সম্মানি বাড়ানো হয়েছে ৫ লাখ ৩১ হাজার ৪০৮ টাকা। আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস বাড়ানো হয়েছে ৫৩ কোটি ১৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৩৯ টাকা।
এসআইবিএল ২০২৪ সালে পরিচালকদের ফিস দিয়েছে ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫৯৬ টাকা। আর ২০২৩ সালে ছিল ৪৪ লাখ ৩৭ হাজার ১৮৮ টাকা। আর ২০২৪ সালে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-বোনাস পেয়েছেন ৫২৯ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার ৭৩ টাকা। ২০২৩ সালে যা ছিল ৪৭৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩ হাজার ৭৩৪ টাকা, যা কোম্পানিটি তার সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
এক্ষেত্রে ব্যাংকটির ঋণ খেলাপি ও আমানতকারীদের অর্থের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের বছর শেষে হতাশ করে এভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন-ভাতা বাড়ানোকে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের অপরিপক্কতা ও অসততার বহিঃপ্রকাশ বলছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, চরম প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতিতে রয়েছে এসআইবিএল। ২০২৪ সালে বিনিয়োগ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এসআইবিএলের সঞ্চিতির প্রয়োজন ছিল ২৩ হাজার ১৫৮ কোটি ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি সঞ্চিতি রেখেছে মাত্র এক হাজার ৫০২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে ২১ হাজার ৬৫৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

এছাড়াও স্টেটরি রিজার্ভে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। কোম্পানিটির স্টেটরি রিজার্ভে রয়েছে ৯৪২ কোটি ৭ লাখ ৩২ হাজার ৯৯০ টাকা। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ১৪০ কোটি ১৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে ব্যাংকের স্টেটরি রিজার্ভ পরিশোধিত মূলধনের সমান হতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে স্টেটরি রিজার্ভে ঘাটতি রয়েছে ১৯৮ কোটি ৮ লাখ ১৮ হাজার ১০ টাকা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির ২০২৪ সালে নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো পার শেয়ার (এনওসিএফপিএস) ঋণাত্বক ৭.৫১ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এনওসিএফপিএস ঋণাত্বক হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি মারাত্বকভাবে নগদ অর্থের সংকটে রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
২০২৪ সালে কোম্পানিটির ইনভেস্টমেন্ট বা গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ৩১৬ কোটি ৫০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে আমানতের তুলনায় গ্রাহকদের ঋণ কম দিতে হয়। কিন্তু এসআইবিএল আমানতের তুলনায় গ্রাহকদের বেশি ঋণ দিয়েছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করেছে এসআইবিএল।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৩ সালে এসআইবিএলের নিট ইনভেস্টমেন্ট ইনকাম ছিল ৭৬১ কোটি ৯৫ লাখ ৩ হাজার ১৪ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৬১৮ কোটি ১৭ লাখ ২০ হাজার ৪৬৫ টাকা। এক্ষেত্রে নিট ইনভেস্টমেন্ট ইনকাম কমেছে ১৪৩ কোটি ৭৭ লাখ ৮২ হাজার ৫৪৯ টাকা বা ১৮ শতাংশের বেশি।

এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে যেকোনো ব্যাংকের সিআরএআর সাড়ে ১২ শতাংশের কম হলেই সেটি ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয় না। ২০২৪ সালে এসআইবিএলের সিআরএআর হয়েছে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এক্ষেত্রে নির্দেশনা অনুসারে ব্যাংকটি মোটেও ভালো অবস্থায় নেই।
এসআইবিএলের চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসান হয়েছে ৪ দশমিক ৩৩ টাকা। অর্থাৎ নতুন পরিচালনা পর্ষদের আমলেও কোম্পানিটি ব্যবসায়িকভাবে ভালো করতে পারেনি।
এসব ব্যাপারে জানতে এসআইবিএলের কোম্পানি সচিব মো. নাজমুল আহসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনসংযো্গ বিভাগে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে জনসংযোগ বিভাগের প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন পাঠানো হলেও সেসবের কোনো উত্তর তিনি দেননি।
এছাড়াও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ সোয়েবকে ফোন করা তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে অন্য এক কর্মকর্তা রিসিভ করে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমের এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি বিষয়গুলো সিএফওকে জানাবেন। পরবর্তীতে সিএফও-কে আবারও ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণে অনেক সময় লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, এসআইবিএলের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের ওপরে আমাদের কোনো আস্থা বা অনাস্থা কোনোটাই নেই। কারণে এসআইবিএলসহ কয়েকটি ব্যাংককে আমরা মার্জার (একীভূত) করতে যাচ্ছি।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments