ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: ভূমি নিয়ে বিরোধ মীমাংসায় সিনিয়র সহকারী জজ এবং সহকারী জজদেরও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মামলা নিষ্পত্তির বিচারিক ক্ষমতা দিতে চায় সরকার। বর্তমানে শুধু ক্ষমতাপ্রাপ্ত যুগ্ম জেলা জজ এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তি করেন। ১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড ট্যানেন্সি অ্যাক্ট (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন) সংশোধন করে সিনিয়র সহকারী জজ এবং সহকারী জজদেরও এ বিষয়ে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত সংশোধিত একটি বিল গত ৬ জুলাই সংসদে পাস হয়েছে। তবে এই সংশোধনী নিয়ে আইন ও বিচারাঙ্গনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ বিচার ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর। এই দুই স্তরের বিচারকদের কাছে প্রায় ২০ লাখ মামলা বিচারাধীন, যা অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মোট মামলার প্রায় ৫০ ভাগ। এ পরিস্থিতিতে সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজদের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মামলা নিষ্পত্তির এখতিয়ার দেওয়া হলে অন্যান্য মামলার জট আরও বাড়বে। ভূমিসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি সময় সাপেক্ষ। তবে আইন মন্ত্রণালয় বলছে, ভূমিসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে জেলাগুলোতে ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের জন্য পৃথক জেলা জজ এবং ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের জন্য অধিক সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হবে।
সংসদে পাস হওয়া স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড ট্যানেন্সি অ্যাক্ট সংশোধন বিলে বলা হয়েছে, ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক হবেন জেলা জজরা। এ ছাড়া ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হবেন যুগ্ম জেলা জজেরা। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার এই বিচারক নিয়োগ দেবেন। এই বিধানের সঙ্গে নতুন ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এভাবে বিচারক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সরকার যুগ্ম জেলা জজদের ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজের ক্ষমতা দিতে পারবে। এ ছাড়া ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল থেকে স্থানান্তর করা মামলা নিষ্পত্তির জন্য এক বা একাধিক সিনিয়র সহকারী জজ বা সহকারী জজকে ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে সরকার নিয়োগ দিতে পারবে।
এর আগে আইনে বলা ছিল, ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক হবেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক অথবা সাবেক বিচারক। কিন্তু কখনও এই আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সমকালকে বলেন, ‘আইনে হাইকোর্টের বিচারক বা সাবেক বিচারককে নিয়ে ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকলেও তা কখনও হয়নি। আবার বর্তমানে আইন সংশোধন করে যা করা হয়েছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে যাদের (সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ) দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে তাদের হাতে এখনই অনেক মামলা বিচারাধীন।
এ অবস্থায় এটি কতটা ফলপ্রসূ হবে তা বলা কঠিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য অধিক সংখ্যক বিচারক দরকার। নতুন করে মামলা অনুপাতে বিচারক নিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া মামলাজটের অভিশাপ থেকে বের হওয়া যাবে না। সরকারের তেমন পরিকল্পনাও দেখছি না। অনেক কিছুই বলা হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন অনেক ধীরগতির।
প্রস্তাবিত আইন সংশোধনের বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার সমকালকে বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় আমাদের (আইন) সঙ্গে আলোচনা করে সংশোধনীটি সংসদে উপস্থাপন করেছে। মামলাজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উপায় খুঁজছি। ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলার অধিক্য আরও বেড়ে গেলে জেলা আদালতগুলোতে পৃথক বিচারক এবং জেলা ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের জন্য পৃথক জেলা জজ নিয়োগ দেওয়া হবে।
জানা যায়, ১৯৭২ সাল থেকেই দেশের প্রতিটি জেলার মাঠ পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে ভূমি জরিপের কাজ শুরু হয়। এখনও বিভিন্ন জেলা ও উপেজলা পর্যায়ে জরিপ কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে যেসব জেলা-উপজেলা পর্যায়ে জরিপের (বিএস রেকর্ড) গেজেট প্রকাশ হয়েছে তাতে ভূমি মালিকের নাম, দাগ ও খতিয়ানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ছোট-বড় ভুলত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে।
এসব ভুলত্রুটি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত জমি ক্রয়-বিক্রয়, দান বা ওই জমির অনুকূলে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভূমি মালিকরা। পাশাপাশি বছরের পর বছর আদালতে ঘুরে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকে।
সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে ৪২টি জেলায় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। বর্তমানে আগের আইন অনুযায়ী যুগ্ম জেলা জজরা এসব ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য মামলার পাশাপাশি ভূমিসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করে থাকেন।
বর্তমানে রেকর্ড সংশোধনের জন্য যুগ্ম জেলা জজদের নিয়ে গঠিত ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালগুলোতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মামলা বিচারাধীন। অন্যদিকে সিনিয়র সহকারী জজরা বর্তমানে দেওয়ানি (টাইটেল, খাস দখল, স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, বণ্টন, ঘোষণামূলক ডিক্রি, মুসলিম প্রিয়েমশন), পারিবারিক, টাকা বা মানিস্যুট, স্মল কজেজ কোর্ট (এসসিসি) ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থাৎ বাড়ি ভাড়া বা সাধারণত ছোট বিষয়), নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল, অপির্ত সম্পত্তি ট্রাইব্যুনাল, বিবিধ/প্রিয়েমশনসহ বিভিন্ন শ্রেণির মামলা নিষ্পত্তি করে থাকেন। একইভাবে সহকারী জজদেরও উল্লিখিত মামলা নিষ্পত্তির এখতিয়ার দেওয়া রয়েছে। তবে তাদের মামলার আর্থিক মূল্যমান ভিন্ন হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড ট্যানেন্সি অ্যাক্ট সংশোধন করে সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজদের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মামলা নিষ্পত্তির এখতিয়ার দেওয়া হলে অন্যান্য মামলা নিষ্পত্তিতে আরও দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেবে।
এ ছাড়া জেলা জজদের অন্যান্য মামলার পাশাপাশি ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে বিচারিক এখতিয়ার দেওয়া হলে এসব আদালতেও মামলা নিষ্পত্তির হার কমার আশঙ্কা রয়েছে।
আইন সংশোধন প্রসঙ্গে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দূর করা এবং যথাসময়ে জনগণের বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে ভূমিসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.
































Recent Comments