ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। শনিবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় যোগ দিতে ওয়াশিংটন ত্যাগ করেন। অন্যদিকে, ইরানের একটি প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যেই সেখানে পৌঁছেছেন। ওই দলে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রয়েছেন।
এদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে তারা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই দাবি নাকচ করে বলেছে, ‘জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।’
ইরান বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের জন্য হওয়া সমঝোতার লঙ্ঘন, আর সে কারণেই তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে।
নতুন এই আলোচনা আজ রোববার থেকেই শুরু হওয়ার কথা। জেডি ভ্যান্স বলেছেন, তিনি ‘পারমাণবিক ইস্যু’ এবং ‘লেবানন যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে’ অগ্রগতি আশা করছেন।
বিমানযাত্রার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সেখানে পরিস্থিতির আসলে উন্নতি হচ্ছে এবং উত্তেজনা কিছুটা কমছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও বলেন, ‘এটি এমন একটি বিষয়, যা আমাদের নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনা করতে হবে, যাতে ইসরায়েল ও লেবানন- উভয়ই নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকে। মূল লক্ষ্য হলো- পুরো অঞ্চলকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখা।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, তার দেশ ‘অন্য পক্ষের কাছ থেকে তাদের অঙ্গীকার পূরণের দাবি জানাবে।’
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আলোচনার উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেবেন বলে তার কার্যালয় থেকে বিবিসিকে জানানো হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দফা আলোচনারও আয়োজন করেছিল।
এর আগে, এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এতে লেবানন পরিস্থিতিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়।
ওই চুক্তিতে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘর্ষ। হেজবুল্লাহর ঘাঁটি মূলত বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরগুলোতে অবস্থিত।
গতকাল শনিবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফ জানিয়েছে যে, তারা হেজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং সংগঠনটির ‘ডজনখানেক সদস্যকে’ হত্যা করেছে। আইডিএফ আরও বলেছে যে, তাদের চারজন সেনাসদস্যও নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি ঘোষণার পরও ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রেখেছিল। তবে গত শুক্রবার বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
চুক্তির আগে ইসরায়েল বলেছিল যে, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা করছে না। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছিল যে, হেজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের সংঘাত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
অন্যদিকে হেজবুল্লাহ দাবি করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলাগুলো বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে ‘নস্যাৎ করার’ কিংবা ‘ব্যর্থ করার’ চেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারও লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে। হেজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করলে লেবানন এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চ ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন।
আইআরজিসি বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা আরও দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির পর খুলে দেওয়া হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ইরানের সামরিক বাহিনী অভিযোগ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারাটি বাস্তবায়ন করেনি। ওই ধারায় ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার’ কথা বলা হয়েছিল।
তবে ইরানের এই ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, ‘জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিকভাবে চলছে।’
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে যাতে এই অবস্থা বজায় থাকে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে না।’
সেন্টকম জানিয়েছে, গতকাল শনিবার ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে এবং সেগুলোর মাধ্যমে বিশ্ববাজারে এক কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল পরিবহন করা হয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের পর্যবেক্ষণ করা ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, শনিবার অন্তত পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে কয়েকটি জাহাজকে ওই এলাকায় পথ পরিবর্তন করে ফিরে যেতে (ইউ-টার্ন) দেখা গেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক উদ্বেগ ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। হরমুজ প্রণালি এতটাই গভীর যে, বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোও এটি ব্যবহার করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনকারী দেশগুলো এবং তাদের ক্রেতারা এই পথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে। এর বার্ষিক বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম




























Recent Comments