ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি’র বিরুদ্ধে শেয়ারকারসাজি চক্রকে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট শেয়ারকারসাজি চক্রের ম্যানুপুলেট (কারসাজি) করা শেয়ার উচ্চ দামে কিনে অর্থ নয়ছয় করেছে। গত নয় মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির বিনিয়োগকৃত ২০ কোটি টাকার শেয়ার ৩ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা জানায়, শেয়ারকারসাজি চক্র বিভিন্ন নিম্নমানের শেয়ার গ্যাম্বলিং করে উচ্চ দরে নিয়ে যায়। চক্রটি এসমস্ত শেয়ার যোগসাজস করে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। পরবর্তীতে শেয়ারগুলো দর কমতে শুরু করায় কয়েক কোটি টাকা লোকসানের কবলে পড়েছে কোম্পানিটি।

তথ্যবিশ্লেষণে জানা গেছে, ৩০ জুন ২০২৪ সমাপ্ত বছরে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শেয়ারে কোম্পানিটির বিনিয়োগ ছিল ২০ কোটি ৬৩ হাজার ৫৪৪ টাকা। ৩১ মার্চ ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটির আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ১৪ কোটি ৪০ লাখ ১১ হাজার ৫৯ টাকা। আর শেয়ার বিক্রি বাবদ লোকসান হয়েছে এক কোটি ৭৩ লাখ ২৮ হাজার ৬১৬ টাকা। এখন শেয়ারগুলোর মার্কেট ভ্যালু এসে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ ২৩ হাজার ৮৭০ টাকা। অর্থাৎ গত নয় মাসে (জুলাই,২৪-মার্চ,২৫) মার্কেট ভ্যালু কমেছে ১৬ কোটি ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৬৭৪ টাকা বা ৮১ শতাংশ।
এদিকে গত এক বছরে আশঙ্কাজনক হারে কোম্পানিটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে গেছে, যা তথ্য বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ার দর কমেছে ৪৮ শতাংশ। ৩ জুলাই ২০২৪ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৯৭ দশমিক ১ টাকা। আর আজ (২ জুলাই) কোম্পানিটির শেয়ার দর এসে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৮০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ার দর কমেছে ৪৬ দশমিক ৩০ টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, কোম্পানিটিতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে ২৯ শতাংশ কমেছে। ৩০ জুন ২০২৪ তারিখে কোম্পানিটিতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২৭ দশমিক ৭৩ শতংশ। আর ২৮ জুন ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটিতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

কোম্পানিটির হাতে নগদ অর্থের পরিমাণও কমে গিয়েছে। ৩১ মার্চ ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটির হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭২ হাজার ২১৪ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩২ কোটি ৮৯ লাখ ২১ হাজার ৫৭১ টাকা। বছরের ব্যবধানে নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছে ১২ কোটি ৮৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৩ টাকা।
সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর থেকে নানা অনিয়ম, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। আগের শিবলী কমিশন কোম্পানিটিকে বিভিন্ন সময় নানাভাবে অনৈতিক সুযোগ সুবিধা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সহজেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য বিগত ফ্যাসিস্টের বিভিন্ন প্রভাবশালীদের কাছে প্লেসমেন্ট শেয়ার নামে-বেনামে বিক্রি করেছে। বর্তমানে কোম্পানিটির প্লেসমেন্ট শেয়ার লক ইন অবস্থায় রয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি এই শেয়ার লক ফ্রি হলেই তারা সেগুলো বিক্রি করে অর্থ বিদেশে পাচার করবে। তাই আমাদের দাবি এই শেয়ার যাতে এখনই লক ফ্রি না হয়।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিকালস যেসমস্ত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সেগুলোর অধিকাংশই ভুয়া। কারসাজি চক্রের সাথে যোগসাজস করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ তছরুপ করার অধিকার কোম্পানিটির নেই। কমিশনের উচিত এসমস্ত বিতর্কিত কোম্পানির বিরুদ্ধে সঠিক তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রফেসর ড. মো. জুনায়েদ শফিককে এসব বিষয়ে জানতে ফোন করা হয়। কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এসব ব্যাপারে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তবে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের কোম্পানি সচিব লরেন্স শ্যামল মল্লিক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, সামগ্রিক অর্থে পুঁজিবাজার নিম্নমুখি রয়েছে। যেকারণে বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে আমরা লাভবান হতে পারিনি। আর অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দর কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে আমাদের শেয়ারও।
এদিকে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস কোন কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করে লস করেছে তার তালিকা চাওয়া হলে তিনি আজ (২ জুলাই) সকালে দেবেন বলে ডেইলি শেয়ারবাজারকে জানান। কিন্তু আজ তিনি সেই তালিকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এসব ব্যাপারে শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও শাকিল রিজভী স্টক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাকিল রিজভী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, বর্তমান পুঁজিবাজার যে-পরিমাণ নিম্নমুখি হয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস। কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে প্রায় ৮১ শতাংশ লোকসান করেছে। কিন্তু মার্কেটতো ৮১ শতাংশ কমেনি। মূলত গ্যাম্বলিং শেয়ার উচ্চ দামে কিনে লোকসান করেছে কোম্পানিটি। আর এই কাজে কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট জড়িত। বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে কারসাজি চক্রের সাথে যোগসাজস করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ এসমস্ত গ্যাম্বলিং শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস। পরবর্তীতে শেয়ারগুলোর মূল্য কমে যাওয়ায় এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লোকসানের কবলে পড়েছে কোম্পানিটি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস যদি কারসাজি চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থ অপচয় করে থাকে, তবে আমরা তা তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধ যথাযথ ব্যবস্থা নিবো।
উল্লেখ্য, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের মোট শেয়ার সংখ্যা ১০ কোটি ৭৪ লাখ ১৬ হাজার ২১৭টি, যার মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩৯ দশমিক ৩১ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ ও ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৩১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
































Recent Comments