নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রাইম ব্যাংক পিএলসির ঋণ বিতরণে আগ্রাসী মনোভাব ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেধে দেওয়ার সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ইতিমধ্যে সর্বশেষ সমাপ্ত বছরে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ খেলাপি প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে খুব শিগগিরিই এই ঋণ খেলাপি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রিম আমানত হারের (এডিআর) নির্ধারিত সীমা ৮৭ শতাংশ এবং ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমের বিনিয়োগ আমানত হার ৯২ শতাংশ। কিন্তু প্রাইম ব্যাংকের এডিআর সীমা ৯৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করেছে। সরকার যেখানে ঋণ খেলাপি কমাতে ব্যাংকগুলোকে সতর্কতার সাথে বিনিয়োগ করতে বলছে, সেখানে প্রাইম ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে ইচ্ছামতো বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে। এতে করে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির কবলে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সীমার চেয়ে বেশি ঋণ দেওয়ায় প্রাইম ব্যাংকের খুব শিগগিরই তারল্য সংকট বাড়বে। বাছ বিচারহীনভাবে ঋণ দেওয়া এবং পর্ষদের প্রভাবশালীরা ভিন্ন নামে ও সুবিধাভোগীদের নামে ঋণ বের করে নিয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্বিকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রাইম ব্যাংক এডিআর সীমা অতিক্রম করেছে কিনা তা আমাদের নির্ধারিত বিভাগ পর্যবেক্ষণ করছে। আশা করি পর্যবেক্ষণ পরবর্তী এ ব্যাপারে কাঙ্খিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে প্রাইম ব্যাংকে গ্রাহকদের ডিপোজিট বা আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৮৮৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর একই সময় ঋণ বিতরণ করেছে ৩৪ হাজার ৩৪৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে আমানত থেকে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে গেছে, অর্থাৎ এডিআর সীমা অতিক্রম করেছে।

এদিকে তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হয়েছে এক হাজার ৪৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল এক হাজার ১১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ঋণ খেলাপি বেড়েছে ৩৩২ কোটি ১০ লাখ টাকা বা ২৯ শতাংশের বেশি।

জানা গেছে, ২০২২ সাল থেকে ব্যাংকটির ঋণ খেলাপি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা অতিসন্নিকটে, জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এজেন্টস থেকে ধার গ্রহণ করেছে ৯ হাজার ৮৯ কোটি ৩১ লাখ ১৯ হাজার ৭৮৬ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৮ হাজার ৬৫ কোটি ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৫২১ টাকা। এ ক্ষেত্রে বছরের ব্যবধানে প্রাইম ব্যাংক এক হাজার ২৪ কোটি ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ২৬৫ টাকা বেশি ধার নিয়েছে।

তারল্য সংকটের কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাইম ব্যাংকের এই ধার গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে বলে মতামত দিয়েছেন ব্যাংকাররা।
কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৮৫ জন। এর আগের বছর যা ছিল দুই হাজার ৯৫৮ জন। এক্ষেত্রে বছরের ব্যবধানে তাদের সংখ্যা বেড়েছে ২৭ জন। আর বছরের ব্যবধানে তাদের বেতন বোনাস-বেড়েছে ৬৬ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫ টাকা। ২০২৪ সালে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী গড়ে ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৬৯২ টাকা করে নিয়েছে, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ঝাড়ুদার, দারোয়ানও রয়েছেন।

প্রাইম ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ব্যাংকটি থেকে বিনিয়োগ উঠিয়ে নিচ্ছেন। অর্থাৎ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। গত আনুমানিক সাড়ে ৮ মাসে প্রায় ১১ শতাংশ উদ্যোক্তা-পরিচালকদের মালিকানা কমেছে। উদ্যোক্তা-পরিচালকদের এভাবে মালিকানা উঠিয়ে নেওয়া এক ধরনের অশনি সংকেত বলছেন, বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গতকাল রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এসব বিষয় জানতে প্রাইম ব্যাংকের কোম্পানি সচিব তানভীর এ সিদ্দিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডেইলি শেয়ারবাজারের এই প্রতিবেদককে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। এরপর তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হয়। কিন্তু প্রায় দুই দিন গত হয়ে গেলেও তিনি প্রশ্নের উত্তর দেননি। এর মাঝে জনসংযোগ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা নাসির হোসেন ডেইলি শেয়ারবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনিও প্রশ্ন তার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু এই প্রতিবেদকের সময় ক্ষেপন করেছেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, সুশাসন নিশ্চিতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। ব্যাংক যেন কোনো তথ্য গোপন না করে, সে-ব্যাপারে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল বর্তমান সরকার, যার ফলে ঋণ খেলাপির সঠিক চিত্র ফুটে উঠছে। আগামীতে ব্যাংকের ঋণ খেলাপির পরিমাণ আরও বাড়বে।
উল্লেখ্য, প্রাইম ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ১৬০ কোটি ৫৯ লাখ ১০ হাজার টাকা, যার মধ্যে উদ্যোক্তা- পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৩৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ।


































Recent Comments