ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঋণ বিতরণের পর সেই অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যবহার হয়েছে কি না, তা বাধ্যতামূলকভাবে বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই করাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য ঋণের অর্থ ব্যবহারের নিরীক্ষা প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান করা হচ্ছে।
ভুয়া ও বেনামি ঋণ, ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া এবং জামানতের মূল্য অতিরিক্ত দেখিয়ে ঋণ নেওয়ার মতো অনিয়ম ঠেকাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ঋণের শেষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিগগিরই এ সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা জারি করা হবে।
নতুন ব্যবস্থায় তৃতীয় পক্ষের বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বড় ঋণের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তা যাচাই করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ভুয়া ও বেনামি ঋণ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দেখিয়ে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার ব্যবসার জন্য নেওয়া ঋণের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি ঋণের অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করে ঋণগ্রহীতার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনে ব্যাংকের পরিচালক, প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কিছু অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। নিয়মিত পরিদর্শন ও বহিঃনিরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো অনিয়ম দীর্ঘদিন আড়ালে থেকে গেছে। তাই ঋণের অর্থের ব্যবহার আলাদাভাবে নিরীক্ষা করলে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন নীতিমালার আওতায় ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ বিতরণের পর গ্রাহক নির্ধারিত খাতেই সেই অর্থ ব্যয় করেছেন কি না, তা যাচাই করা হবে। বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে ঋণের অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ থাকবে এবং প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের চাপ কাজ করে। ঋণ বিতরণের পর সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, তা যথাযথভাবে তদারকি করা হয় না। ফলে ব্যবসার নামে নেওয়া অর্থ জমি কেনা, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ কিংবা বিদেশে পাচারের মতো ঘটনায় ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ঋণের অর্থ ব্যবহারের পর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু অডিট প্রতিবেদন সংগ্রহের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্নও রয়েছে।
বড় ঋণে অনিয়ম শনাক্ত করতে এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত মে মাসে প্রতিটি ব্যাংকের কাছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের বিতরণ ও পুনঃতপশিল করা ঋণের তথ্য চাওয়া হয়।
এসব তথ্যের মাধ্যমে কোন গ্রাহককে কোন খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে, পুনঃতপশিলের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং আগের জালিয়াতি বা অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বেনামে বা অন্য কোনো উপায়ে নতুন ঋণ নিয়েছেন কি না, তা যাচাই করা হয়েছে।
এতে বেশ কিছু অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে বেনামি ঋণ দেওয়ার একটি ঘটনাও ধরা পড়ে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই বড় ঋণ পুনঃতপশিল এবং পর্যাপ্ত জামানত না নিয়ে ঋণ দেওয়ার ঘটনাও পাওয়া গেছে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিভিন্ন দেশেও বড় অঙ্কের ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে বড় ঋণ বিতরণের পর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের অর্থ ব্যবহারের প্রতিবেদন নেওয়া হয়। কোনো ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার সন্দেহ দেখা দিলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিশেষ নিরীক্ষাও করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বড় করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে কিস্তি ছাড়ের আগে স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন ব্যবস্থায়ও বড় ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আর্থিক বিবরণী ও বহিঃনিরীক্ষকের প্রতিবেদন নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।
এদিকে দেশের ব্যাংক খাতে একদিকে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। গত জুন শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ রেকর্ড ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না হওয়ায় বিপুল অর্থ ব্যাংকগুলোর হাতে অলস পড়ে রয়েছে।
গেল জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।
এর পাশাপাশি ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের বড় চাপেও রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফা ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের বিপরীতে সাড়ে ১২ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণের কথা থাকলেও গত বছর শেষে খাতটির মূলধন ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ বিতরণের পাশাপাশি সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য হলো ঋণের অপব্যবহার কমানো, নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি ঠেকানো এবং ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণে জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম
































Recent Comments