ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট : পুঁজিবাজারে আসার প্রক্রিয়ায় থাকা জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট ম্যানুফেকচারিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এন-৯৫ ফেস মাস্ক এর নামে সাধারণ মানের সার্জিক্যাল মাস্ক সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়েছে। অবশ্য ইতোমধ্যেই অপরাধের বিষয়টি স্বীকার করে লিখিতভাবে ক্ষমা ও দায়মুক্তি চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জেএমআই কর্তৃপক্ষ অবশ্য এটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবেই দাবি করেছে। তাদের দাবি, সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক সরবরাহ করতে গিয়ে ভুলে এন ৯৫ মাস্ক এর প্যাকেটে ভরে ফেলা হয়েছে সেগুলো। যদিও এন ৯৫ মাস্ক প্রস্তুতের অনুমোদন পাওয়ার আগেই কোম্পানিটিতে এত বিশাল পরিমাণ প্যাকেট কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট লিমিটেড হচ্ছে জেএমআই গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটি বুক বিল্ডিং পদ্ধতির আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করার প্রক্রিয়াধীন। ইতোমধ্যে এটি রোড শো করে নিলামের (Bidding) মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রির অনুমোদন চেয়েছে আবেদন জমা দিয়েছে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি’র কাছে। এই অনুমোদন পেলে প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার বিক্রির পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি প্রক্রিয়া শুরু করবে এই কোম্পানি। আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে।
বর্তমানে জেএমআই গ্রুপের একটি কোম্পানি জেএমআই সিরিঞ্জেস অ্যান্ড ডিভাইসেস লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আছে। এই কোম্পানির বিরুদ্ধেও নানা ধরনের কারসাজির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করার অভিযোগ আছে। সর্বশেষ গত বছরের প্রথমভাগে কোম্পানি বড় ধরনের তথ্য জালিয়াতি করেছে বলে অভিযোগ আছে। নিপ্রো নামে জাপানি কোম্পানির কাছে ১৬৪ টাকা শেয়ার বিক্রির চুক্তি করেও তা গোপন রেখে উচ্চ দরে শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে বলে রটিয়ে দেওয়া হয়। আর এই কারসাজির মধ্য দিয়ে ২শ টাকার শেয়ারের মূল্য এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৫শ টাকায় উঠে যায়।
জানা গেছে, গত মার্চ মাসে জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে (Central Medical Store Depot -CMSD) ২০ হাজার ৬০০ পিস ‘এন ৯৫’ ফেস মাস্ক সরবরাহ করে। মাস্কের কার্টনে এন ৯৫ ফেস মাস্ক লেখা থাকলেও বাস্তবে ভেতরে থাকা মাস্কগুলো এন ৯৫ ছিল না। এগুলো ছিল সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক।
এন ৯৫ মাস্ক হচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তিতে তৈরি বিশেষায়িত মাস্ক। এই মাস্ক বাতাসে ভেসে বেড়ানো বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কণা ও জীবাণুর ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত আটকাতে পারে। সাধারণভাবে এটি এন ৯৫ মাস্ক নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রে এই মানের মাস্ককে এন ৯৫ বলা হলেও বিশ্বের অনেক দেশের স্বাস্থ্য খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন নামে এই মাস্ককে চিহ্নিত করে থাকে; যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নে এটিকে বলা হয় এফএফপি ২, চীনে বলা হয় কেএন৯৫।
করোনাভাইরাসের পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ এবং আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় যুক্ত চিকিৎসক ও নার্সদের নিরাপত্তায় এই মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বের সব দেশে এই গাইডলাইন মেনেই করোনা মোকাবেলার চেষ্টা করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পিপিই নীতিমালা অনুযায়ী, রোগীর নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য এন-৯৫ মাস্ক পরা জরুরি।

জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিটের কাছ থেকে কথিত এন ৯৫ মাস্ক সংগ্রহ করার পর সিএমএসডি বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য পাঠিয়ে দেয়। দুয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন জায়গা থেকে মাস্কের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। অনেক ডাক্তার ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে এই নকল মাস্কের জন্য তাদেরকে ভীষণ ঝুঁকিতে পরতে হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এরই মধ্যে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে সরবরাহ করা জেএমআই এর মাস্কের প্যাকেটে সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক থাকায় হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী ওই মাস্কের মান সম্পর্কে জানতে চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিএমএসডির পরিচালককে চিঠি দেন।
এর মধ্যে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে এলে তিনি তিনি বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে সোমবার (২০ এপ্রিল) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে।
এদিকে সেদিনই সিএমএসডি’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদ উল্লাহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে স্বীকার করেন, ওই মাস্ক সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক ছিল। প্যাকেটের গায়ে জন্য এন-৯৫ লেখা হয়েছিল ‘ভুল করে’।
জানা গেছে, গত ২ এপ্রিল নকল মাস্ক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিটের কাছে একটি কড়া চিঠি পাঠায় সিএমএসডি। সিএমএসডির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদুল্লাহ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে এ বিষয়ে জেএমআইকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ৩ এপ্রিল জেএমআই সে চিঠির জবাব দেয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক স্বাক্ষরিত চিঠিটি সিএমএসডি গ্রহণ করে গত ৪ এপ্রিল।
করোনাভাইরাস সঙ্কটে বিশ্বজুড়ে মাস্কের সঙ্কটের চিত্র তুলে ধরে ওই চিঠিতে বলা হয়, এই পরিস্থিতিতে তারাও মাস্ক তৈরি করছে, যা ‘ডেভেলপমেন্ট’ পর্যায়ে রয়েছে।
মাস্কগুলো সরবরাহ করা হয়, তখনও দেশে এন-৯৫ এর স্পেসিফিকেশন সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন ছিল না। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে বেশকিছু পণ্য সরবরাহ করে। সরবরাহকৃত পণ্যের সঙ্গে ভুলক্রমে প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট পর্যায়ে তৈরিকৃত ২০ হাজার ৬০০ পিস এন-৯৫ মাস্ক অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা এন-৯৫ এর স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে ‘কমপ্লাই’ করে না।”
ওই পণ্যটি এখনও বিপণন শুরু হয়নি উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, “এ অবস্থায় ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও উপরোক্ত ব্যাখ্যা সদয় বিবেচনাপূর্বক সরবরাহকৃত মাস্ক ফেরত দিয়ে আমাদের অনিচ্ছাকৃত সম্পাদিত ভুলের দায় হতে মুক্তি দানে বাধিত করবেন।”
উল্লেখ, সিএমএসডি দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মেশিনারিজ ক্রয় ও সরবরাহ করে থাকে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় চিকিৎসকদের জন্য পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি তারাই কিনে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করেছে। এন ৯৫ মাস্কের পাশাপাশি পিপিই’র মান নিয়েও অনেক চিকিৎসক প্রশ্ন তুলেছেন।
অনেক জায়গায় পিপিই’র নামে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রেইন কোট সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে গত ২ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেসব্রিফিংয়ে উপস্থিত হয়ে সিএমএসডি’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদ উল্লাহ পিপিই’র মান ঠিক আছে বলে দাবি করেন। পাশাপাশি চিকিৎসকদেরকে পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো চিকিৎসা সরঞ্জামের মান নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে তারা যেন বিষয়টি সিএমএসডিকে দ্রুত অবহিত করেন।
এদিকে দেশে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। মানহীন পিপিই, নিম্নমানের মাস্ক ও গ্লাভসের কারণেই স্বাস্থ্যকর্মীরা এত বেশি হারে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠন। তাই মাস্কের মতো পিপিই এবং গ্লাভসও নকল কিংবা মানহীন কি-না তা অবিলম্বে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের বক্তব্য, সিএমএসডি স্বচ্ছভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করার চেষ্টা করলেও কোন সুযোগ সন্ধানী ও অসাধু গোষ্ঠি জরুরি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিম্নমানের পণ্য দেওয়ার চেষ্টা করতেই পারে। তাই অতি মাত্রায় প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে এবং সন্দেহ পোষণকারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম
































Recent Comments