ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: চোখের চিকিৎসা নিতে গতকাল রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে আসেন কামরাঙ্গীরচরের ফাতিমা খাতুন। বয়স এখনও ৪০ না পেরোলেও ডায়াবেটিসে ভুগছেন দীর্ঘ ১১ বছর। দুই মাস আগে ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ চোখ থেকে পানি পড়া শুরু হয়, সঙ্গে মাথাব্যথা। এর পর আগের মতো আর দেখতে পারছেন না তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথিতে (চোখের রেটিনার রক্তনালির ক্ষত) আক্রান্ত ফাতিমা। বাঁ চোখের আলো এরই মধ্যে নিভে গেছে আর ডান চোখেও দেখেন ঝাপসা।

একই সমস্যা ৬২ বছর বয়সী খালিদ সাইফুল্লাহর। দুই সপ্তাহ আগে চোখে অস্ত্রোপচার করাতে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। অস্ত্রোপচারের আগে চিকিৎসকের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খালিদের ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। মাত্রা অনেক বেশি। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ছাড়া চোখে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন চিকিৎসক। এমনকি দ্রুত চোখে অস্ত্রোপচার না করালে স্থায়ী অন্ধত্বের ঝুঁকি রয়েছে।
শুধু ফাতিমা বা খালিদ নন, এখন অনেকেরই ডায়াবেটিসজনিত অন্ধত্ব দেখা দিচ্ছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাদের প্রায় ১৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথিতে ভুগছেন।
দৃষ্টিশক্তি নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা অরবিসের তথ্য বলছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ রেটিনোপ্যাথি আক্রান্তের ঝুঁকিতে রয়েছে। ৩৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অন্ধত্ব এবং দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ এই রোগ। এমনকি চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের রেটিনা বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ৫০ শতাংশ রোগী এই সমস্যায় ভুগছেন। চোখের পেছনে অবস্থিত আলো-সংবেদনশীল টিস্যু রেটিনার রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা না পেলে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে। তাই অন্ধত্বের ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকরা ডায়াবেটিস আক্রান্তদের বছরে একবার রেটিনাল পরীক্ষার পরামর্শ দেন।
গত নভেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথিতে আক্রান্ত ২৯ শতাংশ মানুষ। সংগঠনটির উদ্যোগে দেশের ১১ হাসপাতালের বহির্বিভাগের এক হাজারের বেশি রোগীর ওপর এ গবেষণা চালানো হয়। তাদের সবার টাইপ-২ ডায়াবেটিস ছিল।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলোজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, রেটিনোপ্যাথিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস। রেটিনোপ্যাথিতে আক্রান্তের হার অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ আমাদের দেশের ডায়াবেটিসে আক্রান্তের অর্ধেক রোগী জানেন না তারা এই রোগে আক্রান্ত।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ডা. আতিকুল হক বলেন, ডায়াবেটিস আক্রান্তের ৮ থেকে ১০ বছর পর ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথি দেখা দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত হলে চিকিৎসায় ভালো করা সম্ভব। তবে এসব রোগী একেবারে শেষ সময়ে আসেন। তিন পদ্ধতিতে এ রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। লেজার, ইনজেকশন ও সার্জারি। তবে এসব চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল।
যাদের নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের বছরে একবার রেটিনা পরীক্ষার তাগিদ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
ইস্পাহানি চক্ষু হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মোমিনুল ইসলাম বলেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের চোখে নানা সমস্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি হয় ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথি। এর কারণে চোখের সংবেদনশীল টিস্যু রেটিনার রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে রক্তনালি ফুটো হয়ে রক্ত বের হয়ে আসে। বর্তমান সময়ে বয়স্কদের পাশাপাশি তরুণরাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথি ধরা পড়লে তা পুরোপুরি সারানো যায় না। তবে নিয়মিত চিকিৎসা, থেরাপি ও পরীক্ষার মাধ্যমে চোখের ক্ষতি এড়ানো যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আফজাল মাহফুজউল্লাহ বলেন, ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর নিয়মিত রেটিনা পরীক্ষা, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি প্রতিদিন ব্যায়াম করলে ডায়াবেটিসজনিত অন্ধত্ব এড়ানো সম্ভব।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.
































Recent Comments