ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: দুই বছর আগে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন ময়মনসিংহের আফসানা বেগম। এক বছর আগে রাজধানীর মহাখালীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতালে সেবা নিতে আসেন তিনি। চিকিৎসকরা তাঁকে পরামর্শ দেন কেমোথেরাপি নেওয়ার। তবে আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় তা আর হয়ে ওঠেনি ৪৫ বছর বয়সী আফসানার। ক্যান্সারের প্রভাবে গত ডিসেম্বরে তাঁর শরীরে দেখা দেয় শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা। ২৮ ডিসেম্বর আবার ক্যান্সার হাসপাতালে সেবা নিতে আসেন তিনি। চিকিৎসকরা দেখে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেন, যার খরচ প্রায় ২৬ হাজার টাকা। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে এসব পরীক্ষা করানো যাবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। টাকার অভাবে পরীক্ষাগুলো করাতে পারেননি আফসানা।

পরবর্তী সময়ে শারীরিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে ২ জানুয়ারি তাঁকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসার পর ২৫ জানুয়ারি আবার ফেরত পাঠানো হয় ক্যান্সার হাসপাতালে।
শ্বাসকষ্টের জন্য চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন অক্সিজেন দেওয়ার। আফসানার স্বজন জানান, ক্যান্সার হাসপাতালে অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকার পরও নার্সরা বাধ্য করেন বাইরে থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনতে।
আফসানা বেগম ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার ক্যান্সার হাসপাতালে এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। মাসখানেক ঢাকায় থাকার পরও ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করতে পারেননি তিনি। বাঁচানো যায়নি তাঁকে। গত ২৭ জানুয়ারি মারা যান তিনি।
আফসানার স্বজনের অভিযোগ, ক্যান্সার হাসপাতালে দালালের অভাব নেই। অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালে শয্যার ব্যবস্থা করে দেয় তারা। আবার অনেকেই শয্যা পেতে উচ্চ পর্যায় থেকে তদবিরও করান। ফলে গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসাসুবিধা থেকে। টাকার অভাবে অনেকেই সেবা না নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন।
নেত্রকোনার বাসিন্দা জুবেদা বেগম ক্যান্সার হাসপাতালে এসেছেন কেমোথেরাপি নিতে। তিনি জানান, দুই বছর আগে পেটে টিউমার ধরা পড়ে। পরে জেলা সদর হাসপাতালে টিউমার অপারেশনও করা হয়। কিন্তু ভালো না হওয়ায় এক পর্যায়ে ক্যান্সারে রূপ নেয়। তিনি জানান, বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় ক্যান্সার হাসপাতালে খরচ কিছুটা কম। কিন্তু পদে পদে ভোগান্তি। সময়মতো কেমাথেরাপি দেওয়ার শয্যা পাওয়া যায় না। এখন পর্যন্ত তিনি আটটি কেমোথেরাপি নিয়েছেন। একবার থেরাপিতে খরচ ২২ হাজার টাকা; সঙ্গে ওষুধ, থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত খরচ কমপক্ষে ৪ হাজার টাকা। আটটি কেমোথেরাপি ও ওষুধ মিলিয়ে ২ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে তাঁর।
জুবেদা বলেন, এই চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমিজমা যা ছিল, সবই বিক্রি করে দিয়েছি। আমার পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে চিকিৎসা-সক্ষমতা না থাকাই ক্যান্সার রোগীদের এমন দুর্ভোগের মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ব্যয়বহুল এ রোগের চিকিৎসায় দেশে সরকারিভাবে ২২টি চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও অধিকাংশেরই অনেক যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে আছে। এ ছাড়া চিকিৎসক-নার্সের পর্যাপ্ত পদ না থাকা, যেসব পদ আছে সেগুলোতেও লোকবলের ঘাটতিসহ নানা সংকট ও জটিলতা রয়েছে। এতে প্রতিবছর দেশে এক লাখের বেশি মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হলেও চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন তাদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
এমন পরিস্থিতিতেই আজ রোববার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘বৈষম্য দূর করি, ক্যান্সার চিকিৎসা নিশ্চিত করি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, দেশে সরকারিভাবে ২২টি সেন্টারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে আরও ১০টি সেন্টার ক্যান্সারের চিকিৎসা দিচ্ছে। নতুন করে হতে যাওয়া ৮টি মেডিকেল কলেজেও ক্যান্সার ইউনিট থাকছে। তবে নতুন সেন্টার যুক্ত হলেও যে হারে রোগী বাড়ছে, তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হাবিবুল্লাহ রাসকিন বলেন, সঠিকভাবে ক্যান্সার শনাক্ত করা এবং স্ক্রিনিং সিস্টেম ও চিকিৎসা প্রোটোকল অবশ্যই থাকতে হবে। এখনই আমাদের সব ক্যান্সার প্রোগ্রামকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার উপযুক্ত সময়, যাতে আমাদের কাছে সঠিক তথ্য থাকতে পারে। তিনি বলেন, দেশে ক্যান্সার রোগের ব্যাপকতা বাড়লেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা সেভাবে বাড়েনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ২০৫০ সালে ক্যান্সারে নতুন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাড়ে তিন কোটিতে পৌঁছাবে, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ বেশি।
১৮৫টি দেশ এবং ৩৬ ধরনের ক্যান্সারের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিষয়ে বলা হয়েছে– এখানে খাদ্যনালি, ঠোঁট, ওরাল ক্যাভিটি এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা বিশ্বে নতুনভাবে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ২৫ লাখ মানুষ; যা ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) এক সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি বলছে, প্রায় পাঁচজনের মধ্যে একজন তাদের জীবদ্দশায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। তাছাড়া প্রতি ৯ জন পুরুষের মধ্যে একজন এবং ১২ জন নারীর মধ্যে একজন ক্যান্সারে মারা যায়।
গবেষণায় তামাক, অ্যালকোহল, স্থূলতা এবং বায়ুদূষণকে বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার রোগী বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেরিতে ক্যান্সার শনাক্ত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে সরকারিভাবে যত ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা নেন, তাদের অধিকাংশই ৫০০ শয্যার মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতালে আসেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির দুই-তৃতীয়াংশ যন্ত্রপাতিই দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। সম্প্রতি দুটি রেডিওথেরাপি যন্ত্র কেনা হয়েছে। এরপরও থেরাপি নিতে গিয়ে এক মাস থেকে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। একসময়ে প্রতিদিন গড়ে হাজারের বেশি থেরাপি দেওয়া যেত এই হাসপাতালে। এখন তা ১৫০ থেকে ২০০ জনে নেমে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটিতে চারটি লিনিয়ার এক্সিলারেটর ও দুটি কোবাল্টসহ রেডিও থেরাপির জন্য ছয়টি যন্ত্র ছিল। বর্তমানে একটি লিনিয়ার ছাড়া বাকি পাঁচ যন্ত্রের কোনোটি পুরোপুরি অকেজো, কোনোটি আবার নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সচল একমাত্র লিনিয়ারটিও সম্প্রতি নষ্ট হয়ে গেলে নানা সমালোচনার মুখে দুটি কেনা হয়েছে। আরও দুটি শিগগির পাওয়া যাবে বলে আশা কর্তৃপক্ষের।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম নিজামুল হক সমকালকে বলেন, হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। এখানে দৈনিক ৫০০ জনের কেমোথেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিপরীতে চাহিদা তিন হাজারের বেশি। এ ক্ষেত্রে রোগীদের অপেক্ষা করার প্রয়োজন হয়। একজন রোগী হাসপাতালে এলেই পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হয়। তবে সব পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যবস্থা আমাদের এখানে নেই।
তিনি বলেন, পরীক্ষানিরীক্ষা করে মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রেও অস্ত্রোপচার ও রেডিওথেরাপি শুরু করতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। নষ্ট হওয়া যন্ত্রগুলো দ্রুত মেরামত করা হবে বলে তিনি জানান।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.
































Recent Comments