নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসএমই প্ল্যাটফর্মের মামুন এগ্রো প্রডাক্টস লিমিটেড এবার সরাসরি কর্মীদের সাথে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তার মুনাফা থেকে কর্মীদের পাওনা অর্থ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে হস্তান্তর করেনি। সেই অর্থ প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে রেখে দিয়েছে, যা শ্রম আইন অনুসারে প্রতিষ্ঠানটি কোনোভাবেই করতে পারে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ অনুসারে বছর শেষ হওয়ার নয় মাসের মধ্যে কোম্পানির কর পূর্ববর্তী মুনাফার ৫ শতাংশ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে জমা দিতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার এই অংশ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে জমা দিচ্ছে না। নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) মামুন এগ্রোর মুনাফা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পাওনা অর্থ এসে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ ১১ হাজার ৯৩২ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৯৪ লাখ ১১ হাজার ৭৬৭ টাকা।

এব্যাপারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, মামুন এগ্রো যেহেতু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে। তাহলে আমাদের সাথেও ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারে। কোম্পানিটি সদ্য বিদায়ী বছরে যে মুনাফা দেখিয়েছে তা আদৌ সঠিক কিনা তা ভালো করে তদন্ত করা উচিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)। এমনও হতে পারে মুনাফা অনেক বেশি হয়েছে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখিয়েছে। যাতে করে ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) কম দিতে হয়।
(মামুন এগ্রো প্রডাক্টস লিমিটেডের অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)
এদিকে কোম্পানিটির নিরীক্ষক জানিয়েছে, বছর শেষে স্থায়ী সম্পদের পুনর্মূল্যায়নের কথা থাকলেও মামুন এগ্রো সেটি করেনি। ফলে সদ্য বিদায়ী বছরে মামুন এগ্রো স্থায়ী সম্পদের যে মূল্য দেখিয়েছে তা আদৌ সঠিক কিনা তা বুঝা যায়নি।
অর্থাৎ এব্যাপারে অসমাপ্ত আর্থিক রিপোর্ট জমা দিয়েছে মামুন এগ্রো, জানিয়েছে কোম্পানিটির নিরীক্ষক আলী জহির আশরাফ অ্যান্ড কো.।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, দিন দিন মামুন এগ্রোর গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ গ্রাহকদেরকে পণ্য সরবরাহ করলেও তাদের কাছ থেকে সঠিক সময়ে অর্থ আদায়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। যেকারণে প্রতিষ্ঠানটির রিসিভেবলস বৃদ্ধি পাচ্ছে। রিসিভেবলস হচ্ছে- একক গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কোম্পানির পাওনা অর্থ।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরে মামুন এগ্রোর ট্রেড রিসিভেবলস ছিল ২৩ কোটি ৪৪ লাখ ৭২ হাজার ৫৮০ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৬৮ লাখ ৭৪ হাজার ২০০ টাকা। বছরের ব্যবধানে ট্রেড রিসিভেবলস বেড়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ এক হাজার ৬২০ টাকা বা ২২ শতাংশ।

নিয়ম অনুসারে রিসিভেবলসের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয় কোম্পানিকে। কিন্তু মামুন এগ্রো রিসিভেবলসের বিপরীতে কোনোরকম প্রভিশন রাখেনি, জানিয়েছে নিরীক্ষক আলী জহির আশরাফ অ্যান্ড কো.।
এদিকে কোম্পানির গ্রাহকদের কাছ থেকে সদ্য বিদায়ী বছরে নগদ অর্থ সংগ্রহের পরিমাণও কমে গিয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে। তথ্য বিশ্লেষে জানা গেছে, ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরে গ্রাহকদের কাছ থেকে মামুন এগ্রোর নগদ অর্থ এসেছিল ৫৬ কোটি ২৭ লাখ ৪৪ হাজার ২৯৮ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫২ কোটি ১১ লাখ ৫ হাজার ৭৭ টাকা।

অর্থাৎ কাগজে কলমে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মুনাফা বেশি দেখালেও গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ অর্থ কম এসেছে ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ২২১ টাকা বা ৭ শতাংশ, যা মোটেও কোম্পানির ব্যবসার জন্য ভালো কোনো লক্ষণ নয় বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এসব ব্যাপারে জানতে মামুন এগ্রোর কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ ইমদাদুল হক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে জানান, আমি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না। আপনি আমাদের প্রধান অর্থ কর্মকর্তার (সিএফও) সাথে যোগাযোগ করেন।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
কোম্পানির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আমরা ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে গত দুই বছর ধরে অর্থ জমা দিচ্ছি না। এটা ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। আর বছরের ছয় মাস আমরা বাকিতে পণ্য বিক্রি করি। আর বাকি ছয় মাস অর্থ সংগ্রহ করি। এবার অর্থ সংগ্রহ কম হয়েছে। যেকারণে রিসিভেবলস বেড়েছে ও ক্যাশ রিসিটস কমেছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশীদ চৌধুরী বলেন, মামুন এগ্রোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ অনেক কম। যেকারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আগ্রহ কমে গেছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা কমেছে ২৭ শতাংশ। শেয়ার দরও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া মামুন এগ্রোর পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা, যেখানে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা-পরিচালক ব্যতীত) মোট মালিকানা রয়েছে ৬৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ
























Recent Comments