বৃহস্পতিবার, ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeএক্সক্লুসিভমার্কেন্টাইল ব্যাংক: অ্যাপসের কার্যক্রম নিয়ে ছলচাতুরি, গ্রাহকদের স্বার্থ উপেক্ষিত (পর্ব-৫)
spot_img
spot_img

মার্কেন্টাইল ব্যাংক: অ্যাপসের কার্যক্রম নিয়ে ছলচাতুরি, গ্রাহকদের স্বার্থ উপেক্ষিত (পর্ব-৫)

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি অনিয়মের বেড়াজাল থেকে বের হতেই পারছে না। অনিয়ম যেন ব্যাংকটির নিয়মে পরিণত হয়েছে, এমনটাই জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গ, আমানত কমে যাওয়া ও চীফ এক্সিকিউটিভ-পরিচালকদের বেতনভাতা অস্বাভাবিক বৃদ্ধিসহ মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নানারকম অনিয়মজনিত খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তারপরেও ব্যাংকটির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ করেনি, যা মোটেও ভালোভাবে গ্রহণ করেনি বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীরা।

জানা গেছে, সম্প্রতি নতুন করে মার্কেন্টাইল ব্যাংক আরেকটি অনিয়মের জন্ম দিয়েছে। ব্যাংকটির নিজেদের অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে লেনদেন করে আসছিলেন গ্রাহকরা। কিন্তু হঠাৎ করে সদ্য বিদায়ী ঈদুল ফিতরে অ্যাপসটির মাধ্যমে বিকাশে লেনদেন বন্ধ করে দেয় মার্কেন্টাইল ব্যাংক। ১৯ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ এই লেনদেন বন্ধ থাকে।

বিনা নোটিশে এই লেনদেন বন্ধ করে মার্কেন্টাইল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এতে করে ব্যাংকের গ্রাহকরা চরম বিপাকে পড়েন। গ্রাহকদের পরিচিত অনেকেরই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। কিন্তু বিকাশ অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ফলে ঈদে গ্রাহকরা তাদের পরিচিতদের সাথে এই অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশে লেনদেন করতে পারেনি। অথচ ছয় মাস অন্তর অন্তর ঠিকই এই অ্যাপসের ব্যবহার বাবদ মার্কেন্টাইল ব্যাংক চার্জ কেটে নিচ্ছে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে।

(মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে সাত পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো পঞ্চম  পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে পরবর্তী পর্ব।)

এ ব্যাপারে মার্কন্টাইল ব্যাংকের হট লাইন নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত চাপের কারণে অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশে লেনদেন বন্ধ করা হয়েছিল।

ভুক্তভোগী মঞ্জুরুল হক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, মানুষ দিন দিন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। নানারকম ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে ব্যাংকটি। আমার মার্কেন্টাইল ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট (হিসাব) রয়েছে। ব্যাংকের অ্যাপসের মাধমে আমি পরিচিতদের বিকাশে লেনদেন করে থাকি। সম্প্রতি বিদায়ী ঈদুল ফিতরে   আমার পরিচিত অনেকের সাথে অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশে লেনদেন করতে পারিনি। এতে করে তারা আমাকে ভূল বুঝেছে। তারা ভেবেছে আমি ইচ্ছা করে তাদের বিকাশে লেনদেন করিনি। অথচ আমি ছিলাম নিরুপায়। আত্মবিশ্বাস ছিল অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশে লেনদেন করতে পারবো। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের গুড়েবালি।

তিনি আরও বলেন, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশে লেনদেন করতে না পারায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমার হাত ছাড়া হয়েছে। আমি সামাজিকভাবে পরিচিত অনেকের কাছে অসম্মানিত হয়েছি। আমার এসব ক্ষতিপূরণ এখন কে দেবে?। এসব ব্যাপারে ব্যাংকটিকে আইন আওতায় আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

মঞ্জুরুল হকের মতো আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, ঈদুল ফিতরে অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে ঈদ করতে গিয়েছিলেন। এই অ্যাপসের মাধ্যমে তাদের সাথে মার্কেন্টাইল গ্রাহকরা বিকাশে লেনদেন করতে পারেনি। এতে করে গ্রামে গিয়ে অনেকে বিপদে পড়েন।

এ ব্যাপারে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুখপাত্র অসীম কুমার সাহা ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, টেকনিক্যাল কারণে বিকাশ অ্যাড মানি সার্ভিস ১৯ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত অ্যাভেলেবল (পর্যাপ্ত) ছিল না। যে-কারণে সে সময় ব্যাংকের অ্যাপস ব্যবহার করে বিকাশে টাকা পাঠাতে পারেনি গ্রাহকরা।

এই কথার প্রেক্ষিতে একাধিক গ্রাহক জানান, কি এমন অ্যাপস ব্যাংকটির গ্রাহকদের জন্য তৈরি করা হলো যে ঈদের সামান্য চাপ সহ্য করতে পারলো না। নিশ্চয় এই অ্যাপস তৈরিতেও দুর্নীতি করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। নিম্নমানের অ্যাপস তৈরি করেছে, যা দিয়ে বৃহত্তর পরিসরে সেবা দিতে পারেনি ব্যাংকটি। অথবা নিজেদের স্বার্থে ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যাপসটি বন্ধ করে রেখেছিল মার্কেন্টাইল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। গ্রাহকদের সুবিধার কথা চিন্তা করেনি ব্যাংকটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্রুত এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।

এদিকে বিকাশের জনসংযোগ কর্মকর্তা শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, অ্যাপসটি যেহেতু মার্কেন্টাইল ব্যাংকের। সেহেতু এই অ্যাপসের যাবতীয় ব্যর্থতা মার্কেন্টাইল ব্যাংকের। এই অ্যাপস বন্ধ, ত্রুটির ব্যাপারে বিকাশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

জানা গেছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখ পরবর্তী মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সঠিক চিত্র ফুটে উঠতে শুরু করেছে। ব্যাংক চরম তারল্য সংকট ও ঋণ খেলাপিতে জর্জরিত রয়েছে, যা ব্যাংক কর্তৃক স্বঘোষিত। এমন পরিস্থিতিতে সদ্য বিদায়ী বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সুদের (ইন্টারেস্ট) বিনিময়ে ধারের পরিমাণ বাড়িয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। এতে করে ব্যবসায়িকভাবে নাজুক পরিস্থিতেতে মার্কেন্টাইল ব্যাংক সুদসহ এই ধার পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। শুধু তাই নয়, খুব শিগগিরই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যাংকের মুনাফায় ও ঘোষিত ডিভিডেন্ডে, এমনটাই মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টারা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, তারল্য সংকট থাকায় গত বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) মার্কেন্টাইল ব্যাংক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এজেন্ট ও ব্যাংক থেকে ধার নিয়েছিল এক হাজার ৫৫০ কোটি ৫৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৭ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরের নয় মাসে (জানুয়ারি- সেপ্টম্বর, ২০২৫) সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে ধার নিয়েছে এক হাজার ৮৩৯ কোটি ৬৫ লাখ ৮৩০ টাকা। নয় মাসের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির ধারের পরিমাণ বেড়েছে ২৮৯ কোটি ১০ লাখ ৩২ হাজার ৪৭৩ টাকা বা ১৯ শতাংশ।

এ ব্যাপারে অসীম কুমার সাহা বলেন, ক্ষুদ্র ও বিনিয়োগের ফান্ডের উৎস থেকে ব্যাংকের বরোয়িং (ধার) সংগ্রহের পরিমাণ ২৯০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিনা নোটিশে গ্রাহকদের না জানিয়ে এভাবে লেনদেন বন্ধ করে দেওয়াটা স্বাভাবিক নয়, এর পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোন উদ্দেশ্য রয়েছে তাদের। একটি ব্যাংকের যেকোন কারণেই লেনদেন বন্ধ থাকতেই পারে। কিন্তু তা আগে থেকে গ্রাহকদের জানাবে না কেন? এমনিতেই অতীতের অনেক বিষয় নিয়ে এই ব্যাংটির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগষ্টের পর সবাই ভেবেছিল বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগীদের ব্যাংক হিসেবে আখ্যায়িত ব্যাংটির অনিয়ম ও দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমে স্বচ্ছ ভাবে পরিচালিত হবে ব্যাংকটি। কিন্তু বর্তমানে তাদের এই রুপ দেখে মনে হচ্ছে এই ব্যাংক কখনোই অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে বের হতে পারবে না। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিৎ ব্যাংটির বিরুদ্ধে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, মার্কেন্টাইল ব্যাংককে আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি। ব্যাংকটি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের অ্যাপসটি নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য বিকাশে লেনদেন স্থগিত করে থাকে তবে ব্যাংকের মর্যাদা (রেপুটেশন) নষ্ট হয়েছে। ব্যাংকটি তার গ্রাহকদের কাছে ছোট হয়েছে।

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments