শনিবার, ২৮শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeঅন্যান্যপরিবেশবিদদের আপত্তির মুখেই নদীর তালিকা চূড়ান্ত
spot_img
spot_img

পরিবেশবিদদের আপত্তির মুখেই নদীর তালিকা চূড়ান্ত

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: পরিবেশবিদ ও গবেষকদের আপত্তির মুখেই দেশে নদনদীর তালিকা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। এই তালিকায় নদনদীর সংখ্যা এক হাজার ৮টি; দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার। খসড়া তালিকায় আগে দীর্ঘতম নদী হিসেবে ইছামতীর নাম ছিল। তবে এবার দেশের দীর্ঘতম নদী বলা হয়েছে পদ্মাকে।

নদী রক্ষা কমিশনের সর্বশেষ তালিকায় বলা হয়েছে, তিন বিভাগের ১২টি জেলায় প্রবাহিত পদ্মা নদীর দৈর্ঘ্য ৩৪১ কিলোমিটার। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া তালিকায় নদীর সংখ্যা ৯০৭টি উল্লেখ করা হলেও এবার বেড়েছে ১০১টি।

গতকাল রোববার বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের নদ-নদী: সংজ্ঞা ও সংখ্যাবিষয়ক সেমিনার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দেশের নদনদীর সংখ্যা ও তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে বই আকারে প্রকাশ করে। শিগগিরই ওইসব নদনদীর নাম গেজেট আকারে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। একই সঙ্গে নদীর সংজ্ঞাও চূড়ান্ত করতে চায় তারা।

নদীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে মতামত জানানোর ঘোষণা ছাড়া পরিবেশবিদ ও গবেষকদের কাছ থেকে কোনো মত নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি গতকালের অনুষ্ঠানেও দেখা যায়নি দেশের অধিকাংশ উল্লেখ্যযোগ্য পরিবেশবিদ ও নদী গবেষক। ছিলেন না সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও। মঞ্চেও নদীবিষয়ক উল্লেখযোগ্য কাউকে দেখা যায়নি। প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক সচিব সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ।

পরিবেশবিদ ও নদী গবেষকরা জেলা প্রশাসক দিয়ে তালিকা করার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, নদীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এ জন্য নদীর সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ ও তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। খসড়া তালিকা নিয়ে তাদের নানা আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি। ভুলে ভরা এ তালিকা বই আকারে প্রকাশ করায় দখলদারদের কাছে এটি দলিল হয়ে গেল। হুট করে এভাবে বই প্রকাশ করা ঠিক হয়নি। এতে তালিকা থেকে বাদ পড়া নদী দখল হয়ে যেতে পারে।

নদী কমিশনের অনুষ্ঠানেই তালিকা নিয়ে বিপত্তি

গতকাল সিরডাপ মিলনায়তনে প্রায় তিন ঘণ্টার অনুষ্ঠানে বেশির ভাগ সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নদীর সংখ্যা ও ভুল বিষয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক প্রধান হাইড্রোলজিস্ট মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার। তিনি বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজার দর বিষয়ক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।

আখতারুজ্জামান তালুকদার জানান, দেশে বর্তমানে ২০০ কিলোমিটারের বেশি নদী রয়েছে ১৪টি। এ ছাড়া ১০০ থেকে ১৯৯ কিলোমিটারের নদী ৪২টি, ১০ থেকে ৯৯ কিলোমিটারের নদী ৪৮০টি এবং ১ থেকে ৯ কিলোমিটারের দৈর্ঘ্যের নদী ৩৭৬টি। এক কিলোমিটারের‌ও কম দৈর্ঘ্যের নদী রয়েছে ৪১টি। সবচেয়ে বেশি নদী সুনামগঞ্জ জেলায়; ৯৭টি। নদনদীর এই তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। তালিকা তৈরিতে তথ্যের প্রধান উৎস ছিল জেলা প্রশাসন। এ তালিকায় নদীর সংখ্যা সংযোজন ও বিয়োজনের কাজ চলবে।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের মতামত চাওয়া হয়। তখন এক সাংবাদিক জানতে চান, সিএস রেকর্ডে গঙ্গা নদী আছে। কিন্তু তালিকায় গঙ্গাকে পদ্মা বলা হয়েছে। নদীর নাম যে বদলে গেল, তাহলে গঙ্গা চুক্তির কী হবে?

এ বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকা আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘জেলা প্রশাসকরা একে পদ্মা বলেছেন, তাই পদ্মা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বইতে গঙ্গা/পদ্মা দুটিই বলা আছে। আমরা তো এখানে দুটি লিখতে পারি না।’ এ সময় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, জেলা প্রশাসকদের ওপর আমরা নির্ভর করেছি।

তখন রাজশাহীর নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিক বলেন, ‘জেলা প্রশাসকদের ওপর যদি শতভাগ নির্ভর করি, তাহলে হারিয়ে যাওয়া নদীগুলো কোথায়? তারা তো এগুলো লিজ দিয়ে দিয়েছেন। নদী কমিশনের বইতে ইছামতী নদী ১১টি লেখা হয়েছে, আসলে হবে ১৬টি। আমি সরেজমিন নদী নিয়ে কাজ করি।

এ সময় মনজুর আহমেদ রাজশাহীর এ গবেষককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘নদীর তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছি। যদি আপনি মতামত আগে দিতেন, তাহলে আমরা নিতে পারতাম।’

এক পর্যায়ে আবার ওই গবেষক কথা বলতে চাইলে তাঁকে থামিয়ে দেন চেয়ারম্যান। তবে শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাবেক সচিব সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদের হস্তক্ষেপে মাহবুব সিদ্দিক বক্তব্যের সুযোগ পান। এ সময় মাহবুব সিদ্দিক অভিযোগ করেন, ‘আমি নদী নিয়ে অনেক গবেষণা করেছি। দেশে দেড় হাজার নদী আমার তালিকায় আছে। এগুলো আমি নদী কমিশনের চেয়ারম্যানকে দিয়েছি। এত কষ্ট করে সরেজমিন ঘুরে নদীর তালিকা করেছি; কিন্তু এটিকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। আমাকে সঙ্গে নিয়ে যান, আমি দেড় হাজার নদী দেখিয়ে দেব। আপনারা আমাকে ডাকেননি। সরেজমিন ঘুরলে নদীর সংখ্যা এত কম হতো না।

অনুষ্ঠানে এক সাংবাদিক বলেন, ‘মনে হয় না মাঠ পর্যায়ে এ তালিকা নিয়ে কোনো কাজ হয়েছে। কারও মতামত নেওয়া হয়নি।’ এ সময় আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘তালিকায় আমরা সবকিছু দিইনি। কারণ এমনিতেই ৯০ পৃষ্ঠা হয়ে গেছে।

অনুষ্ঠানে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘যেভাবে ভুল তালিকা প্রকাশ হলো, এটা তো দলিল হয়ে গেল। তাহলে তো দখলদারদের পক্ষেই গেল। এখন নদী কমিশন কী করবে?’ এ সময় নদী কমিশনের চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘আপনি যেভাবে সাংবাদিকতা করেন, এটা ঠিক নয়। আমরা তালিকা এখনও উন্মোচন করিনি।

এর পর নদী কমিশনের সচিব রফিকুল ইসলাম ওই সাংবাদিকের উদ্দেশে বলেন, ‘এটাকে কি আপনি বাইবেল বা ধর্মগ্রন্থ মনে করেন?’ তখন ওই সাংবাদিক বলেন, ‘এটি একটি দলিল।’ এ সময় মেজাজ হারিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটি দলিল আপনাকে কে বলেছে? আপনি বইটি পড়েছেন? এভাবে কথা বলবেন না। এটি চলমান প্রক্রিয়া। ৫০০ বছরেও কেউ তালিকা বানাতে পারেনি। আমরা পেরেছি। এভাবে মন্তব্য করা দোষনীয়।

অনুষ্ঠানে পানি বিশেষজ্ঞ আবদুস সালাম শিকদার বলেন, ‘জেলা প্রশাসকরা তালিকা দিলেও মাঠ পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করা দরকর। তা না হলে ভুল থেকেই যাবে।

অনুষ্ঠানের শেষে নদী রক্ষা কমিশনের তৈরি নদনদীর তালিকা সংবলিত ‘বাংলাদেশের নদ-নদী: সংজ্ঞা ও সংখ্যাবিষয়ক সেমিনার’ শীর্ষক ব‌ইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এ সময় সাবেক সচিব সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, সবার উচিত জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাজে সহায়তা করা।

গবেষক ও পরিবেশবিদদের আপত্তি

নদী কমিশনের প্রকাশিত তালিকা নিয়ে গতকাল রাতে কয়েকজন পরিবেশবিদ ও গবেষকের সঙ্গে সমকালের কথা হয়। তারা ডিসিদের দিয়ে তালিকা তৈরি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

পানি ও নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নদী হয় না। নদীর কতকগুলো বৈজ্ঞানিক তথ্য লাগবে। নদীর সংজ্ঞার ভিত্তি পৃথিবীর সব জায়গায় একই হতে হবে। তা না হলে আর বিজ্ঞানের প্রয়োজন নেই; প্রশাসন দিয়ে বিজ্ঞান চালালেই হয়! আমার ধারণা, বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা দুই থেকে তিন হাজার হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নদী রক্ষা কমিশন ডিসিদের থেকে নদীর যে তালিকা এনেছে, তা সম্পূর্ণ নয়, সঠিকও নয়। এখানে একক কোনো সংস্থার উদ্যোগে নয়, বরং সরকারি-বেসরকারি সংস্থা মিলে একযোগে পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে হবে।

নদী, জলাভূমি ও পানিসম্পদবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, এ তালিকা বস্তুনিষ্ঠ নয়। নদী কোনো গোপন কিংবা তাত্ত্বিক বিষয় নয়। নদী সবসময় দৃশ্যমান। আমি রংপুরে বাদ পড়া ১০৫টি নদীর তালিকা কমিশনে জমা দিয়েছি। কয়েকটি বাদে বাকিগুলো চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমি সরেজমিন এসব নদী দেখাতে পারব। নদী কমিশনের চেয়ারম্যান নিজেই নদীকে স্বীকার করেন না।

রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা ও চূড়ান্ত তালিকায় শুধু সংখ্যাগত পরিবর্তন আছে। ভুলভ্রান্তি নিয়ে আমরা গণমাধ্যমে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলাম, তা আমলে নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা নিয়ে যে বিতর্ক চলছিল, তা থেকেই গেল।

তিনি আরও বলেন, ডিসিদের থেকে তথ্য নিয়ে অসম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করে বলা হচ্ছে ‘গবেষণা’। কোনো গবেষণার প্রকাশনায় এত ভুল থাকতে পারে না।

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments